
বাংলাদেশে প্রতিবছর বজ্রাঘাতে প্রায় ৩৫০ জন মানুষ প্রাণ হারান। এদের বেশিরভাগই দরিদ্র কৃষক, খোলা জায়গায় কাজ করা শ্রমিক এবং শিশু। তারা মাঠে কাজ করার সময় বা খোলা স্থানে অবস্থানকালে বজ্রাঘাতে নিহত হন। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—এই মৃত্যুর অনেকটাই প্রতিরোধযোগ্য।
বজ্রপাত কেন বাড়ছে?
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে বজ্রপাতের পরিমাণ এবং তীব্রতা দুটোই বেড়েছে। এখন আর বজ্রপাত শুধু বর্ষাকালের ব্যাপার নয়—এপ্রিল ও মে মাসেই দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত, যাকে বলা হয় “পূর্ববর্ষা মৌসুমের বজ্রঝড়”।
বাংলাদেশে বছরে গড়ে প্রায় ৩.৩৬ মিলিয়ন বজ্রপাত ঘটে। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হলো সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও সিলেট জেলা।
এই মৃত্যুর কারণ কী?
মূলত তিনটি কারণে বজ্রপাতজনিত প্রাণহানি বাড়ছে:
- মানুষের অসচেতনতা – অনেকে জানেন না বজ্রপাতের সময় কী করতে হয়, কোথায় আশ্রয় নিতে হয়।
-
নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব – গ্রামীণ এলাকায় অনেক স্থানে ঘনবসতিপূর্ণ হলেও বজ্রপাত থেকে বাঁচার জন্য নির্দিষ্ট কোন আশ্রয়কেন্দ্র নেই।
-
জরুরি সতর্কবার্তা গ্রহণ না করা – এখনো অনেকেই আবহাওয়ার সতর্ক বার্তা জানেন না বা গুরুত্ব দেন না।
বজ্রপাতের সময় কী করবো?
বজ্রপাত দেখা দিলে বা শব্দ শোনা মাত্র নিচের বিষয়গুলো মেনে চলুন:
খোলা মাঠ, ধানক্ষেত, নদী বা হাওরে থাকলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিন
গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি, টিনের চালা বা খোলা ছাউনির নিচে আশ্রয় নেবেন না
পানি থেকে দূরে থাকুন, পানিতে থাকা অবস্থায় বজ্রপাত হলে তা সরাসরি প্রাণঘাতী হতে পারে
ধাতব বস্তু (যেমন মোবাইল ফোন, ছাতা, সাইকেল, ধাতব যন্ত্রপাতি) ব্যবহার এড়িয়ে চলুন
ঘরে থাকলে জানালা-দরজা বন্ধ রাখুন, বিদ্যুৎ চালু থাকলে টিভি, ফ্রিজ বা কম্পিউটার ব্যবহার না করাই ভালো
বাইরে থাকলে গাছের নিচে নয়, বরং নিচু হয়ে দুই পায়ের আঙুলের উপর বসে পড়ুন। তবে শুয়ে পড়বেন না
একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা মনে রাখুন:
“শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাই তখনই”
এই ছোট্ট বাক্যটি আপনার ও আপনার পরিবারের জীবন বাঁচাতে পারে।
কী করা হচ্ছে, কী করা দরকার?
‘সুফল II’ নামে একটি প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনায় ১,৭৫০ জন মানুষকে বজ্রপাতকালীন নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এতে নারী, শিশু, কৃষকসহ ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের সজাগ থাকার উপায় শেখানো হয়।
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আরও বড় পরিসরে এই প্রশিক্ষণ ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। একইসঙ্গে প্রতিটি গ্রামের মানুষকে বজ্রপাত সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।
আমাদের কী করণীয়?
নিজের পরিবার ও আশপাশের মানুষদের বজ্রপাত সম্পর্কে সচেতন করুন
আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়মিত শুনুন ও অনুসরণ করুন
এলাকায় বজ্রপাতকালীন নিরাপদ স্থান নির্ধারণ করে সেখানে দ্রুত যাওয়ার ব্যবস্থা রাখুন
শিশুদের বাইরে খেলতে না দিয়ে ঘরে রাখুন
সামাজিক মাধ্যমে সতর্ক বার্তা ছড়িয়ে দিন
এই মৃত্যুগুলো প্রতিরোধযোগ্য। সচেতনতাই বাঁচাতে পারে জীবন।
আমরা ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, করোনার মতো দুর্যোগে সফলভাবে সচেতনতা গড়ে তুলতে পেরেছি। বজ্রপাতের ক্ষেত্রেও আমাদের সেই মনোভাব দরকার।