
রাইজিংসিলেট- ক্রলিং পেগ পদ্ধতি চালু করে গত বুধবার (৮ মে) ডলারের বিপরীতে টাকার দাম কমিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ১১৭ টাকায় মার্কিন মুদ্রাটি ক্রয়-বিক্রয়ের নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ক্রলিং পেগ হলো মুদ্রা বিনিময়ের এমন পদ্ধতি যেখানে মুদ্রার দরের একটি সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন সীমা নির্ধারণ করা থাকে। ফলে তা একবারেই খুব বেশি বাড়তে বা কমতেও পারবে না।
এ খবর সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তাও বাড়ায়। কিন্তু সব সময় মুদ্রার দাম পড়ে যাওয়া দুশ্চিন্তার কারণ নাও হতে পারে। কোনো কোনো দেশ অর্থনৈতিক লাভের জন্যও নিজেদের মুদ্রার দাম কমিয়ে দেয়। অর্থনীতি ও মুদ্রা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য, গবেষণা এবং সংবাদমাধ্যম ঘেঁটে এর তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা যায়।
প্রথমত, বিশ্ববাজার প্রতিযোগিতামূলক। কাজেই রপ্তানি বাড়ানোর জন্য অনেক দেশ ডলারের দাম বাড়িয়ে দিলে একটি দেশের পণ্যের সঙ্গে অন্য দেশগুলোর পণ্যের বাজার দখলের প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। অর্থ ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত সংবাদমাধ্যম ইনভেস্টোপিডিয়াতে এমন উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে, ডলারের বিপরীতে ইউরো বা জাপানি ইয়েনের দরপতন হলে, ইউরোপ বা জাপানে প্রস্তুতকৃত গাড়ির দাম ডলারের মাপকাঠিতে কমে যাবে।
আইএমএফের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক ২০১৫ তে বলা হয়, মুদ্রার দর ১০ শতাংশ কমালে রপ্তানির পরিমাণ জিডিপির দেড় শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। সুতরাং এতে বিশ্ববাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়ে যায়। এতে রপ্তানি উৎসাহিত হয়, নিরুৎসাহিত হয় আমদানি।
তবে দুটি কারণে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। প্রথমত, বিশ্বব্যাপী কোনো দেশের পণ্যের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেসব পণ্যের মূল্যও বাড়তে শুরু করবে। অবমূল্যায়নের প্রাথমিক উপকারটুকু আর মিলবে না তখন। আবার অন্যান্য দেশগুলো যখন এই প্রভাবটি টের পাবে, তারাও নিজেদের মুদ্রামান নিচে নামাতে চেষ্টা করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, অনেক সময় বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করার জন্য ডলার দাম বাড়ানো হয়। এই ধরনের পদক্ষেপে রপ্তানি উৎসাহিত এবং আমদানি নিরুৎসাহিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট দেশের রপ্তানি বাড়বে এবং আমদানি কমবে। এতে বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস পায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ্ উদ্দিন আহমেদ বলেন, যখন কোনো দেশের ফরেন কারেন্সি কম আসে, সেই তুলনায় দেশ থেকে বিদেশি মুদ্রা বেশি বেরিয়ে যায়, তখন ডিভ্যালুয়েশন করতে হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশেও বাণিজ্য ঘাটতি হাজার কোটি ডলারের ওপরে ঘোরাফেরা করেছে। ইনভেস্টোপিডিয়া জানাচ্ছে, অর্থনীতির তত্ত্ব অনুসারে টানা ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। এটি দেশকে বিপজ্জনক ঋণ পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। পঙ্গু করে দিতে পারে অর্থনীতিকে।
তৃতীয়ত, কোনো সরকারের যদি বড় অঙ্কের ঋণ থাকে, মুদ্রার মান কমলে তাদের সুবিধা হয়। কারণ, যদি পরিশোধের হার সমান থাকে তাহলে টাকার দাম কমলে তাকে সময়ের সঙ্গে কম অর্থমূল্য পরিশোধ করতে হয়। ধরা যাক, সরকারকে তার বকেয়া ঋণের সুদ পরিশোধে প্রতি মাসে ১০০ টাকা দিতে হয়। যদি দেশীয় মুদ্রার অর্ধেক অবমূল্যায়ন করা হয়, তাহলে ১০০ টাকার মান ৫০ টাকার সমান হয়ে যাবে। সুতরাং অবমূল্যায়নের পর ১০০ টাকা শোধ করলে আদতে সরকারের আর্থিক সম্পদ কমবে ৫০ টাকার।
আবার, এই কৌশলটিও সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে ইনভেস্টোপিডিয়ায়। যেহেতু, বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেরই কোনো না কোনোভাবে কিছু ঋণ বকেয়া থাকে, তাই একটি ‘রেস টু দ্য বটম কারেন্সি ওয়্যার’ বা মুদ্রা হিসেবে তলানিতে যাবার যুদ্ধও শুরু হয়ে যেতে পারে- এ বিষয়েও সতর্ক করেছে তারা। যদি দেশটিতে প্রচুর পরিমাণে বিদেশি বন্ড বা বিদেশি ঋণ থাকে, সেগুলোর সুদের অর্থ দিতে হিমশিম খেতে হবে। তখন আর এই পদ্ধতি কাজ করবে না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।