ভুঁইফোড় আশ্বাস দিয়ে হাইকোর্টের প্রসেসিং ফি বাবদ জনপ্রতি ১০,০০০ টাকা করে মোট ২৫,৫০,০০০ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্র। টাকা ফেরত চাইলে কর্মচারীদের চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়া হতো। সিসিকের সাবেক প্রধান – প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান (বর্তমানে ডেপুটেশনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি – কর্পোরেশনে কর্মরত) বিগত দুই দশক ধরে সিসিকের ড্রেনেজ, ছড়া ও নগর উন্নয়ন প্রকল্পের শত শত কোটি টাকার বরাদ্দে একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করে রেখেছিলেন।
আরও পড়ুন —বদলি হয়েও থামেনি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য! সিসিকের দুর্নীতির অ ভি যো গে তোলপাড়
নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে গোপন – সমঝোতার মাধ্যমে কমিশন বাণিজ্য এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ভঙ্গ করে অগণিত অবৈধ নকশা অনুমোদন দিয়েছেন তিনি। ২০০৭ সালের ১/১১ এর জরুরি অবস্থার সময় যৌথ বাহিনী ঘুষ গ্রহণ ও টেন্ডার জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল। শুধু দুর্নীতিই নয়, মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধের সাথেও জড়িয়েছে তাঁর নাম। ২০২৩ সালের ২৩ মে সিসিকের নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের ওপর থেকে ভারী স্টিলের পাইপ পড়ে সেনা সদস্য ল্যান্স কর্পোরাল মো. দেলোয়ার হোসেন নামের এক সেনাসদস্যের মর্মান্তিক – মৃত্যুর ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় পেনাল কোডের ৩০৪ (ক) ধারায় দায়েরকৃত মামলায় (মামলা নং-২৪/১৫০) ১ নম্বর অভিযুক্ত আসামি নূর আজিজ।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকালীন ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় দায়েরকৃত মামলা (মামলা নং-০১, তারিখ: – ০২/০৫/২০২৫) এবং সিআর মামলা (নং-৩৫২/২০২৫)-এর ৬৪ নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি তিনি। বর্তমানে ঢাকায় কর্মরত থাকলেও সিসিকের ব্যাকডেটেড ফাইল প্রস্তুত ও জালিয়াতির পুরো সিন্ডিকেট তিনি ঢাকা থেকেই – নিয়ন্ত্রণ করছেন। সদ্য বগুড়া পৌরসভায় বদলিকৃত সিসিকের সাবেক ভারপ্রাপ্ত – প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আকবর ২০০৭ সালে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী নুর আজিজুর রহমানের মাধ্যমে নাটোর পৌরসভা থেকে সিসিকে যোগ দেন। – দীর্ঘ দুই দশকের কর্মজীবনে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক লুটপাট ও টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।
কদমতলীর নতুন সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ার পর গঠিত তদন্ত কমিটিতে তাঁর নিজের আপন ভাই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার হওয়া সত্ত্বেও আলী আকবরকে – সমন্বয়ক করা নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। চার্জশিটভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতার জোরে তিনি এতদিন পদ আঁকড়ে ছিলেন। অন্যদিকে, নির্বাহী – প্রকৌশলী (পূর্ত) মো. রজি উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও সেফটি গ্যাপ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে জলারপাড় এলাকায় মাত্র ৩ ফুট রাস্তার ওপর অবৈধ বহুতল ভবন নির্মাণ এবং মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে অসংখ্য নকশাবহির্ভূত ভবন অনুমোদনের তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সিসিক থেকে – অঢেল অর্থ আত্মসাৎ করে তিনি নগরীর গোয়াবাড়িতে আনুমানিক এক কোটি টাকা মূল্যের নামফলকহীন বিলাসবহুল বাংলো, ৪৫ লাখ টাকার ব্যক্তিগত কার – এবং একাধিক জমি ক্রয় করেছেন। বিএমজেএ-তে এক সংবাদ সম্মেলনে – যুক্তরাজ্য প্রবাসী কয়সর রহমান তাঁর বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার অনিয়মের নথিপত্র প্রকাশ করেন। এছাড়া সিসিকের উপ-সহকারী প্রকৌশলী এটিএম – সাইদুর রহমান টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ১৫ লাখ টাকার বিলে ১.৫০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ এবং খাদিম এলাকায় সুবিশাল গরুর খামার ও রাজপ্রাসাদোপম বাড়ি গড়ে তুলেছেন।
সিসিকের সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে নিম্নমানের কর্মচারীদের – আকস্মিক কোটিপতি বনে যাওয়ার তথ্যে। ২১ নম্বর ওয়ার্ডের অতিরিক্ত সহকারী প্রকৌশলী বেলাল আহমদও আলী আকবরের ডানহাত হিসেবে কাজ করে বেআইনি ভবন অনুমোদনের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন সম্পদের বিশাল পাহাড়।
সিসিকের প্রশাসনিক ও সেবামূলক প্রায় প্রতিটি শাখাই দুর্নীতির করাল গ্রাসে বন্দি। সিসিকের প্রধান এসেসর মো. আব্দুল বাছিত মোটা অঙ্কের ঘুষের – বিনিময়ে নগরীর বাণিজ্যিক ভবন, বহুতল আবাসিক বিল্ডিং ও অভিজাত মার্কেটগুলোর হোল্ডিং ট্যাক্স (গৃহকর) প্রকৃত পরিমাণের চেয়ে অস্বাভাবিক কম নির্ধারণ করে সিসিকের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি করছেন। প্রধান বর্জ্য – ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবদীন বর্জ্য শাখা ও ঠিকাদারি – প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগসাজশ করে প্রতি মাসে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। – লাইসেন্স প্রধান রুবেল আহমদ তাঁর নিজস্ব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মেয়াদোত্তীর্ণ – লাইসেন্স ও নতুন লাইসেন্সের অজুহাতে প্রতিদিন প্রায় লক্ষাধিক টাকা অবৈধ ঘুষ আদায় করছেন।
সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ – রেজাই রাফিন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা হলেও প্রতিটি বিভাগের প্রশাসনিক তদারকিতে চরম অবহেলা প্রদর্শন করছেন এবং জালিয়াতি – সিন্ডিকেটের পেছনে পরোক্ষ মদদ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সবচেয়ে – অভিনব দুর্নীতি দেখা যাচ্ছে সিসিকের প্রকল্প ও জ্বালানি খাতে। বিভিন্ন প্রকল্পের – নাম দিয়ে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়ে পরবর্তীতে কোনো কারণ দেখিয়ে বা – কাজ না করেই প্রকল্প বাতিল করে অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। অথচ বাতিল বা ভুয়া প্রকল্পের নামে এখনো সিসিকের সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে ভাউচার – বানিয়ে বিভিন্ন পাম্প থেকে তেল কম তুলে বাইরে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা পকেটে ভরছে কতিপয় কর্মকর্তা। অনুসন্ধান চালাতে গেলে সাংবাদিকদের ওপর নেমে আসে নানা হুমকি-ধমকি ও তদবির বাণিজ্যের অপচেষ্টা।
সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সার্বিক উন্নয়ন তৎপরতাকে সচল রাখতে এবং নগরবাসীর নাগরিক অধিকার রক্ষা করতে হলে অনতিবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটকে সিসিক থেকে চিরতরে অপসারণ, তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা এবং দুদকের নিরপেক্ষ ও কঠোর তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।