সুনামগঞ্জের ছাতক থানায় দায়ের করা একটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন শুনানির নির্ধারিত তারিখের আগে আদালতে দাখিলের অভিযোগ উঠেছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বৈধ অফিস আদেশ অমান্য করে এমন প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে-এমন অভিযোগ এনে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপারের কাছে দ্বিতীয়বারের মতো লিখিত আবেদন করেছেন মোছাঃ সিপা বেগম।
৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে দেওয়া আবেদনে ছাতক থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোঃ রোমেন মিয়া, অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ মিজানুর রহমান এবং মামলার ৩ নম্বর আসামি মোঃ গোলাম নবীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
আবেদনে সিপা বেগম উল্লেখ করেন, ২০১৯ সালে জবরদখলের আশঙ্কায় তিনি ছাতক থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরবর্তীতে একই ঘটনার সূত্র ধরে তার স্বামী মোঃ আনছার আলী ১২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ছাতকের আমল গ্রহণকারী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সিআর মামলা নং-২৭/২০২৬ দায়ের করেন। মামলাটি দণ্ডবিধির ৪২০ ও ৫০৬(II) ধারায় দায়ের করা হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আবেদনকারীর দাবি, মামলাটির তদন্তভার ছাতক থানার ওসির ওপর ন্যস্ত হওয়ার পর তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে এসআই মোঃ রোমেন মিয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তদন্তের শুরু থেকেই তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আসামির পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এমনকি অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের বিষয়েও তারা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পারেন বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
আবেদনে আরও বলা হয়, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে একাধিকবার সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল), ছাতক বরাবর আবেদন করা হয়। পরে ৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ছাতক সার্কেল কার্যালয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে সংশ্লিষ্ট ভূমি ও অন্যান্য বিষয়ে কর্তৃপক্ষের মতামত নিয়ে আইনানুগভাবে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে আবেদনকারীর দাবি।
সিপা বেগমের অভিযোগ, তদন্ত কর্মকর্তা তাদের আপসের প্রস্তাব দেন। তারা স্থানীয় মুরব্বিদের উপস্থিতি ছাড়া আপসে রাজি না হওয়ায় তদন্ত কর্মকর্তা তার স্বামীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং মিথ্যা মামলায় জড়ানোর হুমকি দেন। আপসে রাজি না হলে আসামির পক্ষে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয় বলে আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে ১৭ মে ২০২৬ তারিখে ন্যায়বিচার নিশ্চিতের দাবিতে সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল), ছাতকের কাছে চতুর্থবারের মতো আবেদন করেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। ওই আবেদনের পর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের স্মারক আদেশের মাধ্যমে বিষয়টি অনুসন্ধান ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল), ছাতকের ওপর দেওয়া হয় বলে আবেদনে বলা হয়েছে।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ৮ জুন ২০২৬ তারিখে সাক্ষী ও উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে শুনানির জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ জন্য ছাতক থানার ওসিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। ৩০ মে ২০২৬ তারিখে ওসির স্বাক্ষরিত আদেশে সংশ্লিষ্টদের শুনানিতে উপস্থিতি নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও নেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
আবেদনকারীর অভিযোগ, তারা নির্ধারিত তারিখে সাক্ষীদের নিয়ে উপস্থিত হলে জানতে পারেন, শুনানির তারিখ ৮ জুন হলেও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এর তিন দিন আগে, ৫ জুন ২০২৬ তারিখে আদালতে পাঠানো হয়েছে। ফলে শুনানিতে তাদের বক্তব্য বা আপত্তি জানানোর সুযোগ থাকেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরে বিষয়টি সহকারী পুলিশ সুপারকে অবহিত করা হয় এবং তদন্ত প্রতিবেদন সংশোধন ও পুনঃতদন্তের দাবিতে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
আবেদনকারী আরও অভিযোগ করেন, মামলার ৩ নম্বর আসামির দায়মুক্তি নিশ্চিত করতে অর্থের বিনিময়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অফিস আদেশ অমান্য করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। এ বিষয়ে তাদের কাছে সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া অভিযোগ করার পর থেকে তারা প্রকাশ্যে হুমকির মুখে রয়েছেন এবং পরিবার-পরিজনসহ জানমালের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে দাবি করেছেন সিপা বেগম। নিরাপত্তার স্বার্থে অভিযুক্ত ১ ও ২ নম্বর কর্মকর্তাকে বর্তমান দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারের পাশাপাশি অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
আবেদনের সঙ্গে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের স্মারক আদেশ, সহকারী পুলিশ সুপারের আদেশ, ছাতক থানার নোটিশ, আদালতে প্রেরিত তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপি, সাক্ষীদের হলফনামাসহ বিভিন্ন নথি সংযুক্ত করা হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের প্রক্রিয়া সম্পর্কে পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে জানতে এসআই রুমেনের সঙ্গে আলাপ হলে তিনি বলেন, আদালতের দেওয়া সময়ের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। তদন্তে কী পেয়েছেন-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যা পেয়েছি, তা আদালতেই জমা দিয়েছি।