বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উত্তর-পূর্বাঞ্চল,সিলেটের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ইসকন সদস্য প্রবীর কুমার গোস্বামীর প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যাপক দুর্নীতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং ঠিকাদারি সিন্ডিকেট পরিচালনার চাঞ্চল্যকর ও নজিরবিহীন চিত্র প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। ছাত্র জীবনের ছাত্রলীগের রাজনৈতিক পরিচয়কে পুঁজি করে এবং তৎকালীন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিতর্কিত ও প্রভাবশালী সাবেক সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ারের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে প্রবীর কুমার গোস্বামী দীর্ঘদিন ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন স্পর্শকাতর পদে নির্বিগ্নে চাকরি করে আসছেন।
কক্সবাজার থেকে শুরু করে সিলেট ও সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল পর্যন্ত নদী খনন, উপকূল রক্ষা, জিও ব্যাগ ডাম্পিং এবং বাঁধ নির্মাণের নামে শত শত কোটি টাকার সরকারি প্রকল্পের কাজ নিজের অনুগত সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দিয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে। এই সার্বিক দুর্নীতি ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সম্প্রতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল হাদী পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক বরাবর একটি সুনির্দিষ্ট লিগ্যাল নোটিশ প্রেরণ করেছেন।
নোটিশে প্রবীর কুমার গোস্বামীর রাষ্ট্রবিরোধী ও জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের জবাব চেয়ে আগামী সাত কর্মদিবসের ভেতরে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দাখিলের জন্য সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, অন্যথায় তাঁর বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা হিসেবে প্রবীর কুমার গোস্বামী দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জেলা ও সার্কুলার পদে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে আঞ্চলিক প্রশাসনিক প্রধানের পদে উন্নীত হওয়ার পুরো পথেই তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি চাকরি বিধিমালা ভঙ্গের অভিযোগ লেগে রয়েছে। বুয়েটে অধ্যয়নকালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সরাসরি জড়িত থাকার প্রভাবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের পরও তিনি নিজের পেশাগত নিরপেক্ষতা ধরে রাখেননি। চাকরিকালীন সময়ে নিজেকে ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’-এর দাপুটে নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শাসাতেন এবং বিভিন্ন সময়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করতেন।
তৎকালীন ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সার্বক্ষণিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে প্রশাসনিক ক্ষমতার একচ্ছত্র অপব্যবহার চালান তিনি। সরকারি পদের তোয়াক্কা না করে একতরফা দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে লিপ্ত থাকার কারণে কেবল ব্যক্তিগত প্রভাবেই তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হননি, বরং দুর্নীতির বিরুদ্ধে উত্থাপিত সমস্ত অভিযোগকে দীর্ঘদিন ধামাচাপা দিয়ে পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। কক্সবাজারে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে দায়িত্ব পালনকালে প্রবীর কুমার গোস্বামীর প্রশাসনিক নীতিহীনতার চূড়ান্ত রূপ সামনে আসে। রামু উপজেলার প্যাঁচার দ্বীপের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৮১ জন সাধারণ বাসিন্দাদের বসতভিটা, মসজিদ, বিদ্যালয় এবং জীবন জীবিকার একমাত্র মাধ্যম কৃষিজমি রক্ষায় সাগরের ভাঙন থেকে সুরক্ষার আকুল আবেদন জানায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সেই জনগুরুত্বপূর্ণ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি তহবিল থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩৩০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি জিও টিউব প্রতিরক্ষা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তৎকালিন পানিসম্পদ সচিব কবির বিন আনোয়ারের নির্দেশে নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী সাধারণ মানুষের জন্য নির্ধারিত সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে নেন। চরম অনৈতিকতার আশ্রয় নিয়ে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থ ব্যয় করে জিও টিউব ডাম্পিংয়ের কাজ করানো হয় তৎকালীন সচিবের নিজস্ব ব্যক্তিগত রিসোর্ট সুরক্ষায়। জলবায়ুর ঝুঁকি ও নদী ভাঙনে বিলীন হওয়া স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বার্থ শতভাগ জলাঞ্জলি দিয়ে একজন ঊর্ধ্বতন আমলাকে তুষ্ট করতেই প্রবীর কুমার গোস্বামী রাষ্ট্রীয় সম্পদের এই ভয়াবহ অপব্যবহার চালান।
এই আনুগত্য ও অনৈতিক কাজের অঘোষিত পুরস্কার হিসেবেই পরবর্তীতে তাকে নিয়ম ও জ্যেষ্ঠতার তোয়াক্কা না করে সিলেট উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে প্রভাবশালী পদে পদায়ন করা হয়। সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলে পদায়িত হওয়ার পর প্রবীর কুমার গোস্বামীর দুর্নীতি ও অপকর্মের ডালপালা আরও বিস্তার লাভ করে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলা একাধিক মেগা প্রকল্প তদারকির প্রধান দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। সিলেট ও সুনামগঞ্জের হাওরের বোরো ধান রক্ষায় ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ, সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে শত কোটি টাকার ড্রেজিং এবং বন্যা ও ভাঙন প্রতিরোধে নদীর তীর সংরক্ষণের জরুরি প্রকল্পগুলোর তদারকির নামে শুরু হয় নজিরবিহীন লুটপাট। নদী ও হাওর বাঁচানোর এই জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে চরম উদাসীনতা, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার এবং একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অসাধু উপায়ে বিল পাস করিয়ে প্রবীর কুমার গোস্বামী কোটি কোটি টাকার তছরুপ করেছেন বলে আঞ্চলিক ও জাতীয় গণমাধ্যমে একাধিকবার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের সারা বছরের একমাত্র ফসল বোরো ধান রক্ষায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনে তিনি চরম স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেন। প্রবীর কুমার গোস্বামীর প্রত্যক্ষ মদদে স্থানীয় প্রভাবশালী ও পছন্দসই লোকদের দিয়ে পিআইসি গঠন করা হয়, যাদের কাজ ছিল বাঁধ নির্মাণের নামে সরকারি বরাদ্দের বড় অংশ পকেটে ভরা। অত্যন্ত নিম্নমানের মাটি ব্যবহার, প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজের গভীরতা ও উচ্চতা বজায় না রাখা এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ না হওয়া সত্ত্বেও ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট পিআইসি সভাপতিদের বিল পাস করে দেওয়া হতো। হাওরের ফসল রক্ষার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা না করেই প্রবীর কুমার গোস্বামী বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাড় করার অনুমতি দেন, যা স্থানীয় কৃষকদের চূড়ান্ত ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়। একইভাবে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর নাব্যতা বৃদ্ধির জন্য পরিচালিত ড্রেজিং প্রকল্পে দেখা যায় আরেক ভয়াবহ হরিলুট। শত কোটি টাকা বরাদ্দের এই প্রকল্পে নদী খননের ক্ষেত্রে কাজের প্রাক্কলিত মান ও গভীরতা বজায় রাখার ন্যূনতম তদারকি তিনি করেননি।
পর্ব- ১