রাইজিংসিলেট- সন্তানকে শান্ত, ভদ্র ও দায়িত্বশীল হিসেবে গড়ে তুলতে কঠোর শাসনের চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও নিয়মিত ভালো অভ্যাসের চর্চা। ছোটবেলা থেকেই পারিবারিক জীবনে কিছু ইতিবাচক নিয়ম চালু করলে শিশুর আচরণ ও মানসিক বিকাশে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জাপানি সংস্কৃতিতে শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং অন্যের প্রতি দায়িত্ববোধকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। লেখক লিসা কাতায়ামা তাঁর দ্য জাপানিজ ওয়ে অব প্যারেন্টিং বইয়ে সন্তান প্রতিপালনের এমন কিছু অভ্যাসের কথা তুলে ধরেছেন, যা পরিবারের দৈনন্দিন জীবনেও প্রয়োগ করা সম্ভব।
জেনে নেওয়া যাক, শিশুর মধ্যে ভালো আচরণ গড়ে তুলতে যেসব অভ্যাস কাজে লাগতে পারে।
১. ভদ্র আচরণের চর্চা করুন
শিশুরা বড়দের আচরণ অনুসরণ করে অনেক কিছু শেখে। তাই পরিবারের সদস্য ও পরিচিতদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা, সালাম বা শুভেচ্ছা জানানো এবং বিনয়ের সঙ্গে কথা বলার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এতে শিশুও অন্যকে সম্মান করতে শিখবে।
২. নিজের কাজ নিজে করার অভ্যাস গড়ুন
খেলাধুলার পর খেলনা গুছিয়ে রাখা, বই নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা কিংবা ব্যবহৃত পোশাক যথাস্থানে রাখার মতো ছোট কাজ শিশুকে করতে দিন। বয়স অনুযায়ী দায়িত্ব দিলে তার মধ্যে আত্মনির্ভরশীলতা ও দায়িত্ববোধ বাড়তে পারে।
মালয়েশিয়ায় আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম সিলেটের হিরা
৩. জিনিসপত্রের প্রতি যত্নশীল হতে শেখান
বই, খেলনা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস যত্ন করে ব্যবহার করতে উৎসাহ দিন। অপ্রয়োজনে কিছু নষ্ট না করা এবং ব্যবহারের পর গুছিয়ে রাখার অভ্যাস শিশুকে সম্পদের মূল্য বুঝতে সাহায্য করবে।
৪. অন্যের অনুভূতির মূল্য বোঝান
কোনো আচরণে অন্য কেউ কষ্ট পেলে শিশুকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলুন। শুধু ক্ষমা চাইতে বলার পরিবর্তে, তার আচরণে অন্যজনের কেমন লাগতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করুন। এতে সহমর্মিতা ও আবেগ বোঝার ক্ষমতা বিকশিত হতে পারে।
৫. ভাগাভাগি করতে উৎসাহ দিন
খাবার, খেলনা কিংবা প্রয়োজনীয় জিনিস অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। জাপানি ভাষায় ‘দোজো’ শব্দটি কাউকে কিছু এগিয়ে দেওয়া বা নিতে আমন্ত্রণ জানানোর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। এমন সৌজন্যমূলক আচরণ শিশুর মধ্যে সহযোগিতার মনোভাব তৈরি করতে পারে।
৬. পরিচ্ছন্নতার নিয়ম শেখান
জাপানে ঘরে প্রবেশের আগে জুতা খোলার প্রচলন রয়েছে। বাড়িতে জুতা রাখার নির্দিষ্ট স্থান তৈরি করলে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা সহজ হয়। পাশাপাশি শিশুকে নিজের আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতেও শেখানো যায়।
৭. একসঙ্গে সময় কাটানোর সময় মনোযোগ দিন
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সময় মোবাইল ফোন দূরে রাখা এবং শিশুর সঙ্গে খেলতে বা গল্প করতে বসলে তাকে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া জরুরি। এতে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ে এবং শিশুর সঙ্গে বাবা-মায়ের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হতে পারে।
৮. খাবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা শেখান
খাবার তৈরিতে যাঁরা শ্রম দেন, তাঁদের অবদানের কথা শিশুকে বোঝান। জাপানে খাবার গ্রহণের আগে ‘ইতাদাকিমাসু’ বলার প্রচলন আছে, যা খাবারের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত। পরিবারের মধ্যেও খাবারের মূল্য ও অন্যের পরিশ্রমের প্রতি সম্মান জানানোর অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
৯. নিজের পাশাপাশি অন্যের প্রয়োজনও বিবেচনা করুন
শিশুকে শেখান, নিজের চাওয়ার পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রয়োজন ও অনুভূতির প্রতিও মনোযোগ দেওয়া দরকার। তবে ভাগাভাগি করতে শেখানোর সময় শিশুর নিজস্ব প্রয়োজন, ব্যক্তিগত সীমা ও ন্যায্য অধিকারকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
১০. রাগ নিয়ন্ত্রণ ও শান্তভাবে কথা বলার শিক্ষা দিন
শিশুরা বড়দের আচরণ দেখে আবেগ সামলাতে শেখে। তাই রাগের সময় চিৎকার না করে ধৈর্য ধরে কথা বলা, মনোযোগ দিয়ে অন্যের বক্তব্য শোনা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করুন। ভুল করলে শিশুকে অপমান না করে ভুলের কারণ ও পরিণতি বুঝিয়ে বলুন।
ভালো অভ্যাসই হতে পারে সুন্দর ভবিষ্যতের ভিত্তি
প্রতিটি শিশুর স্বভাব, চাহিদা ও বেড়ে ওঠার পরিবেশ আলাদা। তাই একই পদ্ধতি সবার ক্ষেত্রে সমান ফল দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে ভালোবাসা, সম্মান, দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতার চর্চা শিশুর ইতিবাচক বিকাশে সহায়ক হতে পারে। সন্তানকে শেখানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো নিজের আচরণে সেই গুণগুলোর উদাহরণ তৈরি করা।
রাইজিং সিলেট-এর প্রকাশক ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কামাল হোসেন মিঠু বাইক দুর্ঘটনায় আহত
সূত্র: লিসা কাতায়ামার সন্তান প্রতিপালনবিষয়ক বই এবং আপনার দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখিত দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর প্রতিবেদন।