রাষ্ট্রের বিচার ও আইনি কাঠামোর একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ হলো কারাগার। অপরাধীদের সংশোধন ও স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে নির্মিত এই সংশোধনাগারগুলো যদি নিজেই অনিয়ম ও চরম দুর্নীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়, তবে তা সমগ্র প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট আস্থার সংকট তৈরি করে। বর্তমানে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২ ঘিরে ঠিক তেমনই এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বন্দিদের সংশোধন বা পুনর্বাসনের নিরাপদ স্থানের পরিবর্তে এটি অসাধু বাণিজ্য, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও ব্যক্তিগত অর্থ উপার্জনের আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আইনি নিয়মকানুন ও সরকারি প্রশাসনিক বিধিমালাকে সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে এক অপ্রতিরোধ্য অনিয়মের রাজত্ব। এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে মূল অভিযুক্ত হিসেবে সরাসরি আঙুল উঠছে কারাগারের জেলার সৈয়দ জাবেদ হোসেন এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী কাওসার, ডিপ্লোমা নার্স আজাদ ও রহমতসহ আরও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর দিকে।
ওকালতনামায় বাধ্যতামূলক টাকা আদায়, জামিনপ্রাপ্তদের মুক্তিতে চুক্তিবাণিজ্য, স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাতে কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি করে বাড়তি অর্থ নেওয়া, অভ্যন্তরীণ পিসি বাজারের মাধ্যমে জিনিসপত্রের সংকট তৈরি করে চড়া দামে বিক্রি, এমনকি কঠোর নিরাপত্তার ভেতরেও অবাধে মাদক কারবার ও অবৈধ মোবাইল ফোন সুবিধার মতো নানাবিধ গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্ত হওয়া একাধিক বন্দি, তাদের হয়রানির শিকার স্বজন এবং অভ্যন্তরীণ কারাসংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্যে এই ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।
কারা কর্মকর্তা সৈয়দ মোঃ জাবেদ হোসেনের কর্মজীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিভিন্ন কারাগারে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ নতুন কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশ কারা অধিদপ্তরে সহকারী জেল সুপার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা কুমিল্লার অধিবাসী এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একাধিক কারাগারে দায়িত্ব পালনকালে ঘুষ গ্রহণ, সিট বাণিজ্য, ক্যান্টিন দুর্নীতি, সরকারি খাদ্য বরাদ্দ আত্মসাৎ এবং প্রশাসনিক অনিয়মের ধারাবাহিক তথ্য নথিবদ্ধ রয়েছে। সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ যোগদানের পূর্বে তিনি খুলনা জেলা কারাগারে জেলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তার আগে পিরোজপুর জেলা কারাগারেও তিনি একই পদে কর্মরত ছিলেন। খুলনা জেলা কারাগারে ২০২৩ সালের শেষের দিকে দায়িত্বে থাকাকালীন বন্দি ও তাদের স্বজনদের মূল অভিযোগ ছিল অভ্যন্তরীণ ক্যান্টিনে পণ্যের অতিরিক্ত মূল্য আদায় এবং সুনির্দিষ্ট কিছু অসাধু চক্রের মাধ্যমে খাবার সরবরাহে অনিয়ম চালানো। পাশাপাশি বন্দীদের স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় উৎকোচ নিয়ে সিরিয়াল এগিয়ে দেওয়া এবং অনৈতিক অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট বন্দীদের সিট ও ভিআইপি সেলে থাকার বিশেষ সুবিধা দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
একইভাবে পিরোজপুর জেলা কারাগারে দায়িত্ব পালনকালেও জাবেদ হোসেনের বিরুদ্ধে অনিয়মের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। সেখানে কারাবন্দীদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি বরাদ্দ ও খোরপোশের কেনাকাটায় ভুয়া ভাউচার তৈরি করে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়। পিরোজপুর কারাগারে থাকাকালে ভালো সিট বরাদ্দ দেওয়া, অসুস্থতার বাহানায় রোগীদের হাসপাতালে স্থানান্তর কিংবা আরামদায়ক বেড পাইয়ে দেওয়ার নামে বন্দীদের কাছ থেকে অনৈতিক অর্থ আদায় করা হতো। তাছাড়া অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে কারাগারে নিষিদ্ধ বা অবৈধ মালামাল প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়েও স্থানীয় ও প্রশাসনিক পর্যায়ে একাধিক লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ জমা পড়েছিল। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন সময়ে কারা কর্তৃপক্ষের অভ্যন্তরীণ তদন্ত পরিচালিত হয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাকে প্রশাসনিক বদলি বা স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়।
তারও পূর্বে ২০১৮-২০১৯ সালে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ডেপুটি জেলার হিসেবে কর্মরত থাকাকালে সৈয়দ জাবেদ হোসেনের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়। ২০১৯ সালে সারাদেশে কারা প্রশাসনের অনিয়ম খতিয়ে দেখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত বিশেষ তদন্ত কমিটি ১ জন উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি), ২ জন জ্যেষ্ঠ জেল সুপার এবং ৭ জন ডেপুটি জেলারসহ মোট ৪৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর দুর্নীতির প্রমাণ পায়, যে প্রতিবেদনে ডেপুটি জেলার সৈয়দ জাবেদ হোসেনের নাম সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। তৎকালীন চট্টগ্রাম কারাগারের ডিআইজি পার্থ গোপাল বণিক, জ্যেষ্ঠ জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক, জেলার সোহেল রানা বিশ্বাসসহ যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে গুরুতর অবহেলা, শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং বন্দীদের বিশেষ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তার মধ্যে তিনি অন্যতম ছিলেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেই বিশেষ তদন্ত কমিটি তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জোর সুপারিশ করেছিল।
পিরোজপুর ও খুলনা জেলা কারাগারে দায়িত্ব পালনকালে পরবর্তীতে কারা অধিদপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একাধিক তদন্ত কমিটি সরেজমিনে গিয়ে জাবেদ হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর প্রাথমিক সত্যতা পায়। তদন্ত দল দেখতে পায় যে, পিরোজপুর ও খুলনা কারাগারে থাকাকালে বন্দীদের নিয়মবহির্ভূত সুবিধা প্রদান, ভিআইপি সেলের বন্দোবস্ত, নির্ধারিত হাসপাতালের বেড বরাদ্দ এবং দর্শনার্থী দেখার ‘মুলাকাত’ প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে। একই সাথে অভ্যন্তরীণ ক্যান্টিনে অতিরিক্ত মূল্যে নিম্নমানের খাবার বিক্রি এবং নির্ধারিত খোরপোশ ব্যবস্থায় অনিয়ম করার প্রমাণ পান তদন্তকারীরা। এমনকি সরকারি কেনাকাটা ও খাদ্য বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে ভুয়া ও কাল্পনিক ভাউচার তৈরির তথ্যও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের নজরে আসে।
খুলনা ও পিরোজপুর—উভয় কর্মস্থলেই দুর্নীতির প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর তাকে দায়িত্ব থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং দূরবর্তী কারাগারে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়। ধারাবাহিক এই তদন্ত ও শাস্তিমূলক প্রশাসনিক বদলির অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের প্রথম দিকে এই কর্মকর্তাকে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ জেলার পদে পদায়ন করা হয়। সিলেটে যোগদানের পর তার অতীতে প্রমাণিত হওয়া অনিয়ম, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ এবং খুলনা-পিরোজপুরের একাধিক তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে গণমাধ্যমে পুনরায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু পক্ষ থেকে এসব সংবাদকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে পাল্টা আবেদন জানানো হয়েছে, তবে একাধিক জেলায় তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ার পরও বিভাগীয় কঠোর শাস্তি না দিয়ে কেবল এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে স্থানান্তর করে দায়িত্ব বহাল রাখা নিয়ে কারা প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আরও পড়ুন–সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২: অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও নির্যাতনের চাঞ্চল্যকর অ ভি যো গ
সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ যোগদানের পর অনিয়মের অন্যতম প্রধান খাত হয়ে উঠেছে ওকালতনামা প্রক্রিয়া। কারাগারের প্রশাসনিক নিয়মানুযায়ী আইনি সহায়তার প্রথম ধাপে আদালত থেকে একটি ওকালতনামা বন্দির কাছে পাঠাতে হয়। কারাগারে বন্দির স্বাক্ষর এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে জেলারের স্বাক্ষর সম্পন্ন হলে তবেই সেটি আদালতে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়। এই আইনি প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। এখানে প্রতি ওকালতনামায় স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য বন্দির কাছ থেকে বাধ্যতামূলক ২০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০টি ওকালতনামা সই করাতে হয়। কেবল এই একটি খাত থেকেই জাবেদ ও কাওসার সিন্ডিকেট প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। কোনো বন্দি যদি টাকা দিতে ব্যর্থ হয় বা অস্বীকৃতি জানায়, তবে তার ওকালতনামা ৩ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত আটকে রাখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে টাকা না দেওয়া পর্যন্ত ওকালতনামা ফাইল থেকে হারিয়ে গেছে কিংবা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অহেতুক হয়রানি করা হয়।
রাজনৈতিক বা সংবেদনশীল মামলায় জামিন পাওয়া আসামিদের মুক্তি প্রক্রিয়া নিয়েও চলছে বিশাল অঙ্কের চুক্তিবাণিজ্য। আদালত থেকে জামিনের কাগজ আসার পর বন্দিকে স্বাভাবিক নিয়মে দ্রুত মুক্তি দেওয়ার কথা থাকলেও এখানে কৃত্রিম জটিলতা সৃষ্টি করা হয়। বিশেষ ব্যবস্থাপনায় নির্ধারিত সময়ের আগেই কারাগার থেকে মুক্ত করে দেওয়ার দোহাই দিয়ে ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত নগদ চুক্তি করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী টাকা পরিশোধ করলেই কেবল জামিনের আদেশপত্র দ্রুত নিষ্পন্ন করে বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়, অন্যথায় ফাইল নানা অজুহাতে আটকে রাখা হয়।
কারাবিধি ও সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, ১৫ দিন পর পর বন্দিদের সঙ্গে তাদের স্বজনদের বিনামূল্যে দেখা করার বিধান রয়েছে। তবে এই সিন্ডিকেটের কাছে এই মানবিক নিয়মটি অর্থ উপার্জনের একটি লাভজনক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের ১২ দিন আগেই কোনো বন্দির সঙ্গে স্বজনদের দেখা করতে হলে গুচ্ছ গুচ্ছ টাকা গুনতে হয়। ১ হাজার টাকা না দিলে স্বজনদের সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয় না। অভিযোগ অনুযায়ী, সাক্ষাৎপ্রার্থীদের কাছ থেকে এই টাকা সংগ্রহ করে কান্তারগী নামের একটি বিশেষ মাধ্যমের মাধ্যমে জমা নেওয়া হয়। সংগৃহীত এই অর্থ থেকে জেলারের নির্ধারিত পাস হিসেবে ৮০০ টাকা এবং বাকি ২০০ টাকা সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয়। স্বজনদের সাথে কথা বলার ধরন ও স্থানের ওপর ভিত্তি করে টাকার পরিমাণ আরও বাড়ে। সাধারণ জালে ঘেরা কামরা বাদ দিয়ে যদি জেলারের ব্যক্তিগত অফিস বা বিশেষ কোনো সুবিধা ব্যবহার করে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে হয়, তবে গুনতে হয় ৩ হাজার টাকা। একজন সাধারণ বন্দির সঙ্গে বাইরে থেকে স্বজনরা দেখা করতে গেলে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং সাথে নিয়ে আসা জিনিসপত্র বা অতিরিক্ত সুবিধা পেতে হলে অন্তত ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে বাধ্য করা হয়। ১ হাজার টাকা দিলে যেখানে ১৫ দিনের জায়গায় এক দিন পর-পর স্বজনদের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ মেলে, সেখানে টাকা না দিলে মাসের পর মাস বন্দিরা স্বজনদের দেখতে পান না।
কারাগারের ভেতরের বন্দিদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটার জন্য তিনটি দোকান বা ক্যান্টিন রয়েছে, যা ‘পিসিটির বাজার’ নামে পরিচিত। এগুলোতে কোনো সরকারি পণ্য বিক্রি হয় না এবং বাইরে টাঙানো থাকে নির্ধারিত সরকারি মূল্য তালিকা। তবে বাস্তব ক্ষেত্রে তা কেবলই লোক দেখানো। সরকারি নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করে প্রতিটি পণ্যের দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে বন্দিদের কাছে বিক্রি করা হয়। বাজারে সিন্ডিকেট তৈরি করে একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের কফি, যেমন ‘রূপসী গোল্ডেন কফি’ বিক্রি করতে বন্দিদের বাধ্য করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই ব্র্যান্ডটির সঙ্গে জেলারের নিজস্ব বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে। পিসি বাজারের মাধ্যমে কেবল এই এক কফি বিক্রি করেই দিনে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা অবৈধ লভ্যাংশ পকেটে ঢোকানো হয়।
বন্দিদের বসবাসের স্থান অর্থাৎ ওয়ার্ড ও সিট পরিবর্তনকেও ঘুষ বাণিজ্যের অংশ বানানো হয়েছে। কারাবিধি অনুযায়ী প্রয়োজনবোধে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ওয়ার্ড পরিবর্তন হওয়ার কথা থাকলেও এখানে কৃত্রিমভাবে ঘন-ঘন বদলি আতঙ্ক তৈরি করা হয়। প্রতি মাসে বা দুই সপ্তাহে বন্দিদের ওয়ার্ড পরিবর্তনের ভয় দেখিয়ে নগদ টাকা না নিয়ে ব্র্যান্ডেড সিগারেটের মাধ্যমে ঘুষ আদায় করা হয়। ভালো সিটে থাকা বা সুবিধাজনক ওয়ার্ডে স্থান পাওয়ার জন্য ১ কেজি ৫ প্যাকেট বেনসন অথবা অন্তত ২ প্যাকেট ডার্বি সিগারেট দিতে বাধ্য করা হয়। এমনকি পিসি বাজারে গিয়ে মৃদু স্বরে কোনো কথা বললে বা বিনাদোষে বন্দিদের ভয় দেখিয়ে ৫ প্যাকেট সিগারেট দাবি করা নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অতিরিক্ত তথ্যে জানা গেছে, সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এর অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত গোপনে কিন্তু সুসংগঠিতভাবে মাদক ও অবৈধ যোগাযোগ বাণিজ্যের বিশাল নেটওয়ার্ক সচল রয়েছে। কারাগারের ভেতরের কিছু পুরনো প্রভাবশালী কয়েদি ও কর্মচারীর যোগসাজশে ইয়াবা, গাঁজা এবং ফেনসিডিল সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সাধারণ বন্দিদের অতিরিক্ত দামে এসব মাদক কিনতে বাধ্য করা বা আসক্ত বানিয়ে টাকা আদায় করার অভিযোগ রয়েছে। এর পাশাপাশি মোটা অঙ্কের মান্থলি মাসোহারা বা নির্দিষ্ট চার্জের বিনিময়ে অপরাধীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে টাচ স্ক্রিন স্মার্টফোন ও বাটন ফোন। কারাগারের ভেতরে বসেই তারা বাইরের জগতের অপরাধমূলক কাজকর্ম পরিচালনা করছে। কেউ এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খুললে তাকে নিরাপত্তা সেলে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় কিংবা ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে শাস্তির ভয় দেখানো হয়।
এসব সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে সত্যতা ও প্রশাসনিক বক্তব্য জানতে জেলার সৈয়দ জাবেদ হোসেনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে বার বার ফিরে আসতে হয় তার সহযোগী কাওসারের তালবাহানায়। ফলে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কারাগারকে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনাগার হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে অপরাধীরা তাদের ভুল শুধরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ পায়। অথচ সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ যেভাবে প্রকাশ্য ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের রাজত্ব গড়ে তোলা হয়েছে, তাতে সাধারণ হাজতি, সাজাপ্রাপ্ত বন্দি ও তাদের স্বজনদের জীবন বিষিয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষ ও সচেতন নাগরিক সমাজের জোর দাবি, জাবেদ সিন্ডিকেটের এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে অবিলম্বে নিরপেক্ষ ও বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হোক।
এ বিষয়ে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এর জেল সুপার প্রশান্ত কুমারের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ কিছু সমস্যা রয়েছে, তা থেকে পরিত্রাণের জন্য কাজ করা হচ্ছে এবং শীঘ্রই এসব সমস্যার সমাধান করা হবে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, বিষয়টিতে তিনি ঢাকা থেকে ফিরেই তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। একটি আধুনিক ও সুশৃঙ্খল কারাগার গঠনে যা যা করা দরকার, কারা কর্তৃপক্ষ তা করতে সব রকম প্রস্তুতি নিচ্ছে।