সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ বন্দীদের হয়রানি, ঘুষ বাণিজ্য ও শারীরিক নির্যাতনের লাগামহীন অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্ত হওয়া কয়েকজন বন্দী, তাদের স্বজন এবং কারাকর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। অভিযোগের তির মূলত বর্তমান জেলার সৈয়দ জাবেদ হোসেনের দিকে। তিনি যোগদানের পর থেকেই কারাগারে নানা খাতে প্রকাশ্যে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কারাগারে ঘুষ লেনদেনের অন্যতম প্রধান খাত হয়ে উঠেছে ‘ওকালতনামা’। নিয়ম অনুযায়ী আদালত থেকে ওকালতনামা আসার পর বন্দীর স্বাক্ষর এবং জেলারের অনুমোদন শেষে তা পুনরায় আদালতে পাঠাতে হয়। তবে প্রতিটি ওকালতনামায় স্বাক্ষরের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে ২০০ টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০টি ওকালতনামা আসায় কেবল এ খাত থেকেই দৈনিক প্রায় ৭০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। টাকা না দিলে ওকালতনামা ফাইলবন্দী করে রাখা হয়, এমনকি কখনো কখনো তা হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
এছাড়া জামিন প্রক্রিয়া ও স্বজনদের সাক্ষাৎ ঘিরে গড়ে উঠেছে বড় আকারের বাণিজ্য। রাজনৈতিক মামলার আসামিদের জামিনের পর নির্ধারিত সময়ের আগেই বিশেষ ব্যবস্থায় বের করে দিতে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত চুক্তি করা হয়। অন্যদিকে সরকারি নিয়মে ১৫ দিন পরপর স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ থাকলেও, নির্দিষ্ট সময়ের আগেই দেখা করতে চাইলে কারারক্ষীদের মাধ্যমে ১ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। এর একটি বড় অংশ জ্যৈষ্ঠ কর্মকর্তাদের পকেটে যায় বলে অভিযোগ। আর ‘অফিস কল’-এ বন্দীদের সাথে দেখা করতে হলে ১ জন বন্দীর জন্য ৩ হাজার এবং ২ জনের জন্য ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত গুণতে হয়।
কারাগারের ভেতরের কেনাকাটার দোকান ‘পিসির বাজার’-এও চলছে মারাত্মক অনিয়ম। সেখানে সরকারি মূল্য তালিকা টাঙানো থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। বন্দীদের কাছে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি দামে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। কেউ এই চড়া দামের প্রতিবাদ করলে বা মুখ খুললে নামিয়ে আনা হয় অমানবিক নির্যাতন। বন্দীদের নারকেল গাছের সঙ্গে উল্টো করে বেঁধে সুবেদাররা লাঠি দিয়ে প্রহার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যা প্রায়শই জেলারের উপস্থিতিতে ঘটে।
ওয়ার্ড ও সিট পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও টাকার বদলে ভিন্ন ধরণের ঘুষ গ্রহণের কৌশল অবলম্বন করা হয়। বন্দীদের নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে ওয়ার্ড পরিবর্তনের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত সুবেদারদের দামি ব্র্যান্ডের সিগারেট (যেমন ৫ প্যাকেট ‘বেনসন’ বা ‘ডার্বি’) ঘুষ দিতে হয়। পিসির বাজারে জমা রাখা বন্দীদের রেজিস্টার খাতার ব্যালেন্স থেকে সরাসরি এসব সিগারেটের দাম কেটে নেওয়া হয়।
মুক্ত পাওয়া বন্দীদের একাংশের মতে, দেখা করার ১৫ দিনের সময়সীমা এবং কারাগারের সার্বিক অব্যবস্থাপনাই এসব ঘুষ বাণিজ্যের প্রধান সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। অভিযোগের সত্যতা ও বক্তব্য জানতে জেলার সৈয়দ জাবেদ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। সংবেদনশীল এই সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি বন্ধে ও বন্দীদের সার্বিক নিরাপত্তায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ দাবি করছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
ভিডিও লিংক—-সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২: অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও নির্যাতনের চাঞ্চল্যকর অ ভি যো গ- বিস্তারিত ভিডিওতে –
চলমান,,