উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফি সাধক হজরত শাহজালাল (রহ.) ও তাঁর ভাগনে হজরত শাহপরান (রহ.)-এর বংশপরিচয়, পারিবারিক পটভূমি এবং উত্তরাধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা জনশ্রুতি ও বিভ্রান্তি প্রচলিত রয়েছে। তবে মধ্যযুগীয় ফারসি ইতিহাসগ্রন্থ, প্রাচীন দলিল এবং গবেষকদের পর্যালোচনায় তাঁদের পরিচয় ও বংশগত সম্পর্ক সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক চিত্র উঠে এসেছে।
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে ৩৬০ জন আউলিয়াকে সঙ্গে নিয়ে সিলেটে আগমন করেন হজরত শাহজালাল (রহ.)। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আপন ভাগনে হজরত শাহপরান (রহ.)। ইতিহাসে তাঁদের সম্পর্ক মামা-ভাগনের বলেই উল্লেখ রয়েছে।
আরও পড়ুন–শাহজালাল (রহ.) মাজারে হাজার কোটি টাকার লুটের অ ভি যোগ, আলোচনায় সামুন সিন্ডিকেট
প্রাচীন ফারসি গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, হজরত শাহজালাল (রহ.) আরবের হেজাজ অঞ্চলের ইয়েমেনের হাদ্রামাউতের অধিবাসী ছিলেন। তাঁকে ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর বংশধর এবং মক্কার সম্ভ্রান্ত কুরাইশ গোত্রের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে হজরত শাহপরান (রহ.)-এর পৈতৃক নিবাসও ইয়েমেনের একই অঞ্চলে ছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
ফারসি নথি অনুসারে, হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর পিতা ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক সৈয়দ মাহমুদ ইবনে মোহাম্মদ ইবনে ইব্রাহিম, যিনি শেখ মুহাম্মদ তাবরিজী নামেও পরিচিত। তাঁর মাতা সৈয়দা হাসিনা ফাতিমা ছিলেন প্রখ্যাত বুজুর্গ জালালুদ্দিন সূরুখ বোখারীর কন্যা। শাহজালাল (রহ.)-এর সহোদরা বোনের গর্ভেই জন্মগ্রহণ করেন হজরত শাহপরান (রহ.)। অপরদিকে, শাহপরান (রহ.)-এর পিতা ছিলেন হজরত মুহাম্মদ, যিনি সুহরাওয়ার্দিয়া তরিকার একজন সুপরিচিত সাধক হিসেবে পরিচিত।
উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক সাধনার উদ্দেশ্যে তাঁরা মক্কা ও মদিনায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। পরবর্তীতে ইসলাম প্রচারের মহান দায়িত্ব নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন করেন এবং সিলেটে ইসলামের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
আরও পড়ুন—অপরাধ রাজ্যের স ম্রা ট কে এই ইন্তাজ আলী? খুঁটির জোর কোথায়?
ইতিহাসবিদদের মতে, হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর রক্তসম্পর্কীয় ভাগনে হিসেবে কেবল হজরত শাহপরান (রহ.)-এর নামই প্রামাণ্য সূত্রে পাওয়া যায়। তবে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে অবস্থিত হজরত শাহ মালুম (রহ.)-কে স্থানীয়ভাবে শাহজালাল (রহ.)-এর আরেক ভাগনে হিসেবে প্রচলিত জনশ্রুতি থাকলেও প্রাচীন ফারসি দলিল বা নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক নথিতে এ দাবির পক্ষে শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায় না। গবেষকদের মতে, শাহ মালুম (রহ.) ছিলেন ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম সঙ্গী। সুফি পরম্পরায় স্নেহ বা আত্মিক সম্পর্কের কারণে ‘ভাগনে’ সম্বোধনের রীতি থেকেই এ জনশ্রুতির উৎপত্তি হতে পারে।
ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, হজরত শাহজালাল (রহ.) সারাজীবন অবিবাহিত বা ‘মুজাররাদ’ জীবনযাপন করেন। ফলে তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ সন্তান বা রক্তসম্পর্কীয় উত্তরাধিকারী ছিল না। একইভাবে হজরত শাহপরান (রহ.)-এরও কোনো রক্তসম্পর্কীয় বংশধরের প্রামাণিক রেকর্ড পাওয়া যায় না। সে কারণে বর্তমানে খাদেম বা অন্য কোনো পরিচয়ে তাঁদের প্রত্যক্ষ রক্তের বংশধর দাবি করার ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।
আরও পড়ুন–চোরাচালানের জন্য সিলেটের পাঁচ উপজেলার অন্তত একশ’টি স্থান ঢুকছে অ স্ত্র, বি স্ফো রক ও মা দ ক
মাজারের ওয়াকফ সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার নিয়ে অতীতেও আদালতে মামলা হয়েছে। ১৯৪২ সালে কয়েকজন খাদেম নিজেদের হজরত শাহপরান (রহ.)-এর উত্তরসূরি দাবি করে সিলেট জেলা জজ আদালতে স্বত্ব মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে ১৯৬০ সালের ২৫ ডিসেম্বর আদালত মামলাটি খারিজ করে দেন এবং দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় তা গ্রহণযোগ্য নয় বলে রায় দেন।
ফলে বর্তমানে শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.)-এর মাজারে দায়িত্ব পালনকারী খাদেম বা সেবায়েতরা মূলত মাজার পরিচালনা ও সেবার সঙ্গে যুক্ত পরিবারের উত্তরসূরি; তাঁদেরকে এই দুই মহান সুফি সাধকের প্রত্যক্ষ রক্তসম্পর্কীয় বংশধর হিসেবে প্রমাণ করার মতো নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল নেই।
হজরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.)-এর জীবনী, বংশপরিচয় ও ঐতিহাসিক তথ্যের প্রধান উৎস হিসেবে মহিউদ্দিন খাদেম রচিত ‘সুহেলি ইয়্যামনি’, মির্যা মোহাম্মদ হাসান বেগের ‘গুলজার-ই-আবরার’ এবং ইতিহাসবিদ ফেরেশতার ‘তারিখ-ই-ফেরেশতা’ গ্রন্থের নাম উল্লেখ করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রাচীন ফারসি ফলকলিপিতেও তাঁদের পরিচয় ও অবদানের উল্লেখ রয়েছে।