কামাল হোসেন মিঠু ::সিলেট-জাফলং জাতীয় মহাসড়কে মধ্যরাতের নীরবতা চিরে দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে একটি নম্বরপ্লেটহীন টাটা ২০৭ পিকআপ। সীমান্ত এলাকা জাফলং থেকে ছেড়ে আসা এই গাড়ির গন্তব্য সিলেট শহর। আপাতদৃষ্টিতে গাড়িতে রয়েছে কাঁচাসবজির বস্তা। তবে সীমান্ত থেকে শহর পর্যন্ত একাধিক পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তল্লাশিচৌকি (চেকপোস্ট) অতিক্রম করার দৃশ্য উসকে দিচ্ছে বড় প্রশ্ন—সবজি পরিবহনের আড়ালে শহরে ঢোকে না তো নিষিদ্ধ মাদক কিংবা অবৈধ অস্ত্র?
সম্প্রতি জাফলং থেকে সিলেট শহর পর্যন্ত রাতের মহাসড়কে অনুসন্ধানে ধরা পড়ে এক অদ্ভূত দৃশ্য। নম্বরপ্লেট ছাড়া দ্রুতগতির পিকআপটি হরিপুর বাজার পার হয়ে জৈন্তাপুর থানা চেকপোস্টে পৌঁছালে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য টর্চের আলো ফেলে গাড়িটি থামান। পেছনে সবজি দেখে ড্রাইভারের পাশে থাকা ব্যক্তির সাথে দৃশ্যত ‘হাত মেলানো’র পরই ছেড়ে দেওয়া হয় সেটি। কোনো প্রকার কাগজপত্র পরীক্ষা বা তল্লাশি ছাড়াই গাড়িটি পুনরায় শহরের দিকে ছুটতে শুরু করে।
একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে শাহপরাণ থানা এলাকার বটেশ্বর চেকপোস্টে। সেখানেও স্পিডব্রেকারে গতি কমানোর পর পুলিশের সংকেতে গাড়ি থামে এবং মুহূর্তের মধ্যে হাত মেলানোর সমঝোতায় পার পেয়ে যায় গাড়িটি। পরবর্তীতে দাসপাড়া এলাকায় সিএনজিতে থাকা টহল পুলিশের টর্চের সংকেত, সেখানে গাড়ি থামা ও একজন অজ্ঞাত যুবকের গাড়িতে ওঠা—সবকিছুই ঘটে তল্লাশি ছাড়াই। কেবল টিলাগড় ও হাতিম আলী মাজারের পেছনের মোড়ে টহল পুলিশ থামানোর চেষ্টা করলেও সংকেত উপেক্ষা করে গাড়িটি শিবগঞ্জ হয়ে দ্রুত কেটে পড়ে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, চেকপোস্টগুলোতে তল্লাশির নামে এই লোকদেখানো কার্যক্রম মূলত সীমান্তভিত্তিক অপরাধী চক্রকে সুবিধা দিচ্ছে। সম্প্রতি সিলেট নগরের বালুচর এলাকা থেকে র্যাবের বিপুল পরিমাণ অবৈধ মদ উদ্ধারের ঘটনা প্রমাণ করে যে, মহাসড়কের বাধা এড়িয়ে এসব চালান শহরে প্রবেশ করছে। যদি তল্লাশিই না হয়, তবে এই রূপসজ্জার চেকপোস্ট রেখে কার লাভ—সেই প্রশ্ন এখন জনমনে।
অন্যদিকে, এই অবৈধ যাতায়াত ও চাঁদা/সমঝোতার প্রভাব পড়ছে না ভোক্তা পর্যায়েও। সীমান্ত থেকে সবজি আনার পর মধ্যরাতের সিন্ডিকেট ও মোড়ে মোড়ে হওয়া অনৈতিক লেনদেনের খরচ যোগ হচ্ছে সাধারণ মানুষের বাজারে। ফলে ভোক্তা সস্তায় সবজি পাচ্ছে না, বরং লাভবান হচ্ছে চোরাচালান ও চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত অসাধু চক্র।
সীমান্ত এলাকা থেকে নম্বরপ্লেট ছাড়া গাড়ির এমন অবাধ যাতায়াত এবং পুলিশি চেকপোস্টে রহস্যজনক ‘হাত মেলানো’ সিলেটের সার্বিক নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলছে। অবিলম্বে মহাসড়কের চেকপোস্টগুলোতে কার্যকর তল্লাশি ও সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানো না হলে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পণ্য ও অস্ত্রের প্রবাহ আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
ভিডিও লিংক—সীমান্ত পার হয়ে আসা সবজিবোঝাই টাটা ২০৭ মডেলের গাড়ির চালক নগরীর সবজির আড়তের উদ্দেশে রওনা দেন।