বিশেষ প্রতিনিধি:সিলেটের পর্যটনসমৃদ্ধ ও সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাটে মাদক, চোরাচালান এবং অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন বন্ধে অত্যন্ত কঠোর আইনানুগ অবস্থান গ্রহণ করেছে থানা পুলিশ। গোয়াইনঘাট থানায় অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে মো. ওমর ফারুক মোড়ল যোগদানের পর থেকে উপজেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান আগের চেয়ে বহুগুণ জোরদার করা হয়েছে। ফলে সীমান্ত কেন্দ্রিক সক্রিয় অপরাধী চক্র, চোরাচালানি ও নদীপথের অবৈধ দখলদাররা চরম কোণঠাসা হয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে।
উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর এই সমন্বিত ধারাবাহিক তৎপরতায় ইতোমধ্যে এলাকায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। অপরাধ দমনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন ইউনিয়নে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক সভা ও সুধী সমাজের সাথে নিয়মিত মতবিনিভব কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে। সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাট ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে দীর্ঘদিন ধরেই মাদক ও চোরাচালান চক্রের জন্য সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। তবে সম্প্রতি পুলিশি নজরদারি বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব চক্রের তৎপরতা অনেকাংশে স্থবির হয়ে এসেছে।
গোয়াইনঘাট থানা সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত এলাকা দিয়ে আসা বিভিন্ন অবৈধ পণ্যের অনুপ্রবেশ ও মাদক পাচার রুখতে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সার্বক্ষণিক চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। ওসি মো. ওমর ফারুক মোড়ল দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রতিনিয়ত সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় বিশেষ তল্লাশি অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এসব অভিযানে একাধিক চিহ্নিত মাদক কারবারি ও চোরাচালানিকে আইনানুযায়ী গ্রেফতার করে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং বড় অঙ্কের চালান জব্দ করা হয়েছে। ওসি মো. ওমর ফারুক মোড়ল বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকা হিসেবে গোয়াইনঘাটে মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধ করা আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। অপরাধী যে-ই হোক না কেন, ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অপরাধ প্রতিরোধ ও আইন বাস্তবায়নে আমাদের কঠোর পদক্ষেপ নিয়মিত অব্যাহত থাকবে।
উপজেলার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও নদী রক্ষায় অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধেও চরম কঠোর অবস্থানে রয়েছে থানা পুলিশ। পরিবেশ আইনের ব্যাঘাত ঘটিয়ে নদী ও ইজারা বহির্ভূত এলাকা থেকে বালি ও পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে একের পর এক মোবাইল কোর্ট ও বিশেষ যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সম্প্রতি হাদারপার বালুমহাল এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগে ১২ জন ব্যক্তিকে হাতেনাতে আটক করা হয়। একই সাথে ঘটনাস্থল থেকে অবৈধকাজে নিয়োজিত ২০টি ড্রেজার মেশিন, ২০টি বাল্কহেড নৌকা এবং ৬টি বালুবাহী ট্রলার ধ্বংস ও বিকল করা হয়। এছাড়া হাজীপুর বালুমহাল এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অপরাধে আরও ৩০ জনকে আটক করা হয় এবং ১৫টি ড্রেজার মেশিন ধ্বংস করা হয়েছে। অবৈধভাবে নদী থেকে পরিবেশ ধ্বংস করে বালু ও পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে চলমান এ কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ আগামী দিনগুলোতেও একইভাবে অব্যাহত থাকবে বলে স্পষ্ট করেছেন ওসি।
এদিকে বিছনাকান্দি ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় পূর্বে জব্দকৃত পাথর পরিবহন ও খালাস নিয়ে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। বিষয়টির মূল সত্যতা উন্মোচন করে থানা পুলিশ ও উপজেলা ভূমি প্রশাসন স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। প্রশাসন জানায়, অতীতে বিভিন্ন অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে জব্দকৃত বিপুল পরিমাণ পাথর সম্পূর্ণরূপে সরকারি নিয়মবিধি মেনে আদালতের নির্দেশে প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে গোয়াইনঘাট উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাকারিয়া হোসেন জানান, বিছনাকান্দি, হাদারপার ও জাফলং এলাকায় বিভিন্ন সময়ে সরকারি স্বার্থে জব্দকৃত পাথরসমূহ স্বচ্ছতার সাথে সরকারি বিধিমোতাবেক প্রকাশ্য নিলাম দেওয়া হয়েছে। নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতা ব্যক্তিরাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রদর্শনপূর্বক আইনসম্মতভাবে সরকারের নির্ধারিত ফি প্রদান করে পাথর খালাস ও পরিবহন করছেন।
ওসি মো. ওমর ফারুক মোড়ল এ বিষয়ে যোগ করে বলেন, নিলামে বৈধভাবে ক্রয়কৃত পাথর ছাড়া অন্য কোনো নতুন পাথর উত্তোলন বা অবৈধ পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিষয়টি সঠিকভাবে না জেনে বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটি স্বার্থান্বেষী মহল প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ বিষয়ে অত্যন্ত সজাগ রয়েছে এবং পাথর পরিবহন নিয়ন্ত্রণে একাধিক স্থানে বিশেষ চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, পুলিশ যখনই কঠোর অবস্থান নিয়ে অবৈধ চোরাচালান, মাদক এবং নদী থেকে বালু-পাথর লুটপাটের পথ বন্ধ করে দেয়, তখনই অপরাধী ও কায়েমী স্বার্থান্বেষী মহলগুলো পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে নানা প্রকার ভিত্তিহীন অভিযোগ ও গুজব তৈরি করতে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
ওসি মো. ওমর ফারুক মোড়ল জানান, আমরা যখনই বালু ও পাথর লুটপাটকারীদের টুঁটি চেপে ধরেছি, তখনই তারা কোণঠাসা হয়ে নিজেদের রক্ষার জন্য পুলিশের বিরুদ্ধে অসত্য প্রচারণায় লিপ্ত হচ্ছে। কিন্তু কোনো ধরনের অপপ্রচারে আমাদের নিয়মিত আইনি কার্যক্রম থমকে যাবে না। অপরাধীদের শিকড় উপড়ে ফেলতে গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ সংকল্পবদ্ধ। পুলিশের নিয়মিত সামাজিক তদারকি, নিয়মিত অভিযান এবং আইন প্রয়োগে কোনো শিথিলতা না থাকায় গোয়াইনঘাটের সাধারণ ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও সর্বসাধারণের মধ্যে স্বস্তি ও সুরক্ষার আবহ তৈরি হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই দৃশ্যমান উন্নয়নে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা বিধান, চোরাচালান প্রতিরোধ এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গোয়াইনঘাট থানা পুলিশের এই জনবান্ধব ও কঠোর অভিযান ভবিষ্যতেও নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকবে।