কম্বল আত্মসাৎ, ছুটি না দেওয়ায় দুই নবজাতকের মৃত্যু, অসুস্থ কনস্টেবলের মৃত্যু, ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক মন্তব্য ও অধস্তনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার—বিচার হবে কবে?
সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) মোগলাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেনকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে আসায় পুলিশ প্রশাসনের জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। জব্দ করা চোরাচালানের কম্বল আত্মসাতের অভিযোগ থেকে শুরু করে অধস্তন পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ, ছুটি না দেওয়ার কারণে একাধিক মর্মান্তিক ঘটনার অভিযোগ, ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি জব্দ করা ভারতীয় কম্বল আত্মসাতের ঘটনা। মামলার নথি, আদালতের কার্যক্রম এবং এসএমপি কমিশনারের দপ্তরের নথি অনুযায়ী, একটি চোরাচালানবিরোধী অভিযানে ৫৬০টি ডাবল-পার্ট কম্বল জব্দ হলেও মামলার এজাহারে ৪৩০টি কম্বল দেখানোর অভিযোগ ওঠে। পরে আদালতের নির্দেশে গঠিত তদন্ত দল থানায় সংরক্ষিত কাভার্ডভ্যান থেকে ৫৬০টি কম্বলই উদ্ধার করে। এ ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলেও অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ওসি মনির হোসেনের বিরুদ্ধে এখনো দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এদিকে কনস্টেবল মামুনুর রশিদের অভিযোগ আরও বেশি মানবিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তার দাবি, অন্তঃসত্ত্বা অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য বারবার ছুটি চাইলেও ওসি আবেদন ফরওয়ার্ড করেননি। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমোদন পাওয়া সত্ত্বেও তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি। সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় তার স্ত্রী বাড়িতেই অপরিণত যমজ সন্তানের জন্ম দেন। পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুই নবজাতকেরই মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় মামুনুর রশিদ এসএমপি কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
এর আগে একই থানার কনস্টেবল মো. মতিন মিয়ার ক্ষেত্রেও চিকিৎসার জন্য ছুটি না পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পরও তিনি ছুটি পাননি। পরে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলেও তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। সহকর্মীদের অভিযোগ, ছুটির বিষয়ে অনুরোধ করলে ওসি আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন।
অন্যদিকে কনস্টেবল সুশান্ত বৈষ্ণব লিখিত অভিযোগে দাবি করেন, সরকারি গাড়ির যান্ত্রিক ত্রুটি সম্পর্কে অবহিত করার পর ওসি তাকে ধর্মীয় পরিচয় টেনে আপত্তিকর ও সাম্প্রদায়িক ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং চাকরি নষ্ট করে দেওয়ার হুমকি দেন। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন কনস্টেবল সাইফুলও। তার অভিযোগ, সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে জনসমক্ষে তাকে অপমান, গালিগালাজ এবং শারীরিকভাবে আক্রমণের চেষ্টা করা হয়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বিভিন্ন সময় ওসি মনির হোসেন অধিকাংশ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কম্বল আত্মসাতের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, কোনো কম্বল চুরি হয়নি; তদন্তে গণনার ভুল হয়েছিল। ছুটির অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য, ছুটি অনুমোদনের ক্ষমতা তার নয় এবং তিনি প্রয়োজনীয় সময়ে সদস্যকে ছেড়ে দিয়েছেন।
এসএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (সদর ও প্রশাসন) জানিয়েছেন, কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হয়। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, যখন একই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে একাধিক গুরুতর অভিযোগ, আদালতের পর্যবেক্ষণ, লিখিত অভিযোগ, বিভাগীয় নথি এবং একাধিক ভুক্তভোগীর বক্তব্য সামনে আসে, তখন তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে এত বিলম্ব কেন?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু ব্যক্তিগত অনিয়ম নয়; বরং ক্ষমতার অপব্যবহার, দায়িত্বে অবহেলা, অসদাচরণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার শামিল। সুশাসন নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকরাও বলছেন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও দুর্বল হবে।
এখন জনমনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—একজন থানার প্রধান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যখন এতগুলো গুরুতর অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে, তখন তদন্তের অগ্রগতি কোথায়? অভিযোগগুলো যদি ভিত্তিহীন হয়, তবে তা দ্রুত পরিষ্কার করা প্রয়োজন। আর যদি সত্য হয়, তাহলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সময়ের দাবি।