সিলেটের পর্যটন স্বর্গ হিসেবে পরিচিত জাফলং এখন চোরাচালান ও চাঁদাবাজির অভিযোগে আলোচনায়। পাহাড় আর ডাউকি নদীর স্বচ্ছ পানি দেখতে আসা পর্যটকদের চোখের সামনেই ভারতীয় পণ্যের অবৈধ কেনাবেচা চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। স্থানীয়দের দাবি, আব্দুল মান্নান ওরফে মান্নান মেম্বার ও তাঁর ছোট ভাই লোকমানের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। বিজিবি ক্যাম্পের নাগালের মধ্যেই তারা এই অবৈধ কারবার পরিচালনা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
প্রশাসনের বিভিন্ন ইউনিটের ‘লাইনম্যান’ পরিচয়ে এই দুই ভাই পুরো সীমান্ত এলাকাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিজেদের ‘পকেট সাম্রাজ্যে’ পরিণত করেছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
আরও পড়ুন–প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের সফরে আলোচনায় মান্নান মেম্বার, উঠছে নানা প্রশ্ন
সরেজমিনে জাফলং জিরো পয়েন্ট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পর্যটকরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি ভারতীয় কম্বলসহ বিভিন্ন ধরনের কসমেটিক কেনাকাটায়ও ব্যস্ত। বিজিবি ক্যাম্পের সন্নিকটে প্রকাশ্যে এমন হাট দেখে অনেক পর্যটকও বিস্ময় প্রকাশ করেন।
ঢাকা থেকে আসা এক পর্যটক বলেন, ‘আমি পরিবার নিয়ে জাফলংয়ের সৌন্দর্য দেখতে এসেছিলাম। কিন্তু এখানে এসে দেখছি বিজিবি ক্যাম্পের পাশেই ভারতীয় কম্বলে ও কসমেটিকের হাট বসেছে। হকাররা ও দোকানিরা যেভাবে পণ্য বিক্রি করে, এখানে ভারতীয় চোরাই পণ্য সেভাবেই বিক্রি হচ্ছে।
জাফলং কি পর্যটন কেন্দ্র নাকি চোরাচালানের বাজার, তা বোঝা দায়। প্রশাসনের চোখের সামনে এসব কীভাবে সম্ভব, তা ভেবে আমি অবাক হচ্ছি।
আরও পড়ুন–মধ্যরাতের সিলেট-জাফলং মহাসড়ক: চেকপোস্টে শুধুই হাত মেলানো, সবজির আড়ালে বাড়ছে চোরাচালান শঙ্কা
আরেক পর্যটক বলেন, পর্যটকরা কোনো রাখঢাক ছাড়াই ৫-১০টি করে কম্বল ও কসমেটিক কিনে গাড়িতে তুলছেন। দোকানদাররা প্রকাশ্যেই বলছেন এগুলো বর্ডার দিয়ে আনা। এটা দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।
অনুসন্ধানে স্থানীয়রা বলেন, জাফলং সীমান্তের প্রায় ২৫টি পয়েন্ট এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মান্নান মেম্বার নিজেকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ‘লাইনম্যান’ এবং তাঁর ভাই লোকমান নিজেকে থানা পুলিশের ‘লাইনম্যান’ পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি ও চোরাচালান সমন্বয় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিদিন সীমান্ত দিয়ে আসা ৬০ থেকে ৭০টির বেশি কাঁচা মরিচ ও টমেটো ভর্তি অটোরিকশা (টমটম) থেকে ‘ডিবি পুলিশের’ নাম ভাঙিয়ে ১ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। এছাড়া ভারতীয় জিরা,কসমেটিক, কিটকাট চকলেট, লোশন, চিনি ও চা-পাতা সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের সময় প্রতি ‘কিট’ বা প্যাকেট/বস্তা বাবদ ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব পণ্য মান্নান ও লোকমানের বাড়ি সংলগ্ন লাল মাটি এলাকার গোপন গোডাউনে মজুত করা হয়।
বিজিবি ক্যাম্পের সামনে মান্নান মেম্বারের চারটি দোকান দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, দোকানগুলোতে ভারতীয় চোরাচালানি পণ্য বিক্রি করা হয়। সেখানে লোকমান হোসেনকে উপস্থিত থাকতে দেখা গেলেও সাংবাদিকদের ক্যামেরা ও প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার পর তিনি কৌশলে দোকান ছেড়ে চলে যান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, পুলিশ বা ডিবির টাকা মান্নান ও লোকমান ভাই তোলেন। বিজিবি ক্যাম্পের সামনেই তাঁদের চারটি দোকান আছে, যার সবগুলোই ভারতীয় চোরাই মালে ভর্তি।
সিন্ডিকেটের ভয়ে নলজুরি ও বল্লাঘাট এলাকার বাসিন্দারা মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, এখানে মান্নান মেম্বারের হুকুম ছাড়া একটা সুপারিও পার হতে পারে না। তাঁর ভাই লোকমান সারা রাত বর্ডারে দাঁড়িয়ে মাল ঢুকায়।
সূত্রের দাবি, মান্নান মেম্বার রাজনৈতিক পরিচয় বদলাতে অত্যন্ত পটু। বিগত সরকারের আমলে প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ নির্বাচনী প্রচারক হিসেবে সক্রিয় থাকলেও ৫ আগস্টের পর তিনি নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে সক্রিয় হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, তাঁর সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করলে সাংবাদিকদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে।
এদিকে জাফলং পর্যটন এলাকার বিভিন্ন দোকানে ভারতীয় ব্র্যান্ডের বিভিন্ন ধরনের কসমেটিক পণ্যও বিক্রি হতে দেখা যায়। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এসব দোকানে বিভিন্ন ধরনের বিদেশি কসমেটিক সহজেই পাওয়া যায় বলে স্থানীয়দের দাবি। তবে এসব পণ্য বৈধভাবে আমদানি করা হয়েছে কি না, নাকি অন্য কোনো উপায়ে বাজারে এসেছে-এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব পণ্যের বৈধতা, আমদানি-সংক্রান্ত কাগজপত্র ও মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি বা যাচাই-বাছাই খুব একটা চোখে পড়ে না।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও দায়িত্বশীল সংস্থার নিয়মিত নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
এ ব্যাপারে সিলেট জেলা ডিবির ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘মান্নান’ নামে কাউকে তিনি চেনেন না। এ ধরনের কোনো ‘লাইন’ বা ‘লাইনম্যান’ও নেই। সঠিক প্রমাণসহ তাঁদের নাম ব্যবহার করে চাঁদা আদায়ের বিষয়টি জানানো হলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি জানান।
আরও পড়ুন—হাজীপুর কইন্যাজঙ্গলে অবৈধ ড্রেজারে চা-বাগানের ভূমি ধ্বংস: নেপথ্যে কামরুল-খাইরুল-জুবায়ের!
গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওমর ফারুক মোড়ল বলেন, ‘পুলিশের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি বা চোরাচালান করার কোনো সুযোগ নেই। অপরাধী যেই হোক, তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা কোনো সিন্ডিকেটকে প্রশ্রয় দেব না। পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারী কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে, স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বলেন, পুলিশের নাম করে কেউ চাঁদা চাইলে তাকে হাতেনাতে ধরে খবর দিলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যারা এ ধরনের মিথ্যাচার করছে, তাদের কাছে কোনো প্রমাণ থাকলে তা দেওয়ার জন্যও তিনি আহ্বান জানান।
জাফলং সীমান্তের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে শুধু মৌখিক আশ্বাস নয়, মাঠপর্যায়ে দ্রুত ও কার্যকর যৌথ অভিযান চান স্থানীয়রা। সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগগুলো তদন্ত করে সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে জাফলংকে চোরাচালানমুক্ত ও নিরাপদ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পুনরুদ্ধার করা হোক।