নদীর নির্দিষ্ট অংশ থেকে পলি বা মাটি উত্তোলন করে তা আবার নদীর ভেতরেই অন্য জায়গায় ফেলার মতো ভয়াবহ অনিয়ম প্রত্যক্ষ করেছেন স্থানীয়রা। নদীর গভীরতা ও প্রস্থ নিশ্চিত না করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে শতভাগ বিল পরিশোধ করা হয়। ড্রেজিংয়ের মূল উদ্দেশ্য সফল না হলেও সরকারের বিপুল অর্থের সাশ্রয় না হয়ে তা চলে যায় প্রবীর কুমার গোস্বামী ও তাঁর সিন্ডিকেটের পকেটে। এছাড়াও প্রতি বর্ষা মৌসুমে নদীর আকস্মিক ভাঙন ঠেকানোর নাম করে ‘জরুরি কাজ’-এর অজুহাতে দরপত্র ছাড়াই কোটি কোটি টাকার জিওব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ বাস্তবায়ন দেখানো হতো।
জরুরি ভিত্তিতে সম্পাদিত এসব কাজের কোনো সঠিক পরিমাপ বা স্বচ্ছ হিসাব রাখা হতো না। কেবল কাগজে-কলমে ভুয়া হিসাব দাঁড় করিয়ে জিওব্যাগ ডাম্পিংয়ের বরাদ্দ তছরুপ করা হয় এবং নির্দিষ্ট কিছু সিন্ডিকেট ঠিকাদারের সঙ্গে আগে থেকে ঠিক করা কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে বিল অনুমোদন করে নেওয়া হতো। তৎকালীন ক্ষমতার দাপট বজায় রাখতে প্রবীর কুমার গোস্বামী কেবল অর্থনৈতিক দুর্নীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদকে নিজস্ব রাজনৈতিক প্রভাবের হাতিয়ারে পরিণত করেছিলেন। কক্সবাজার ও সিলেট অঞ্চলে কর্মরত থাকাকালে সরকারি অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়ন তহবিলের অর্থ থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল ও মূর্তি স্থাপন করেছিলেন তিনি।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় চরম ক্ষুব্ধ জনতা রাষ্ট্রীয় অর্থে নির্মিত এসব রাজনৈতিক স্থাপনা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। আইনি নোটিশে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে কীভাবে সরকারি পদে আসীন একজন কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ ব্যবহার করে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন। কেবল দলীয় তোষনই নয়, এর আড়ালে বিভিন্ন ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে প্রকল্প বরাদ্দকে ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য রূপান্তর করতেন তিনি। এছাড়া রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে ভারতের সাথে বিশেষ সম্পর্ক রক্ষার নিমিত্তে ২০২৪ সালের ১০ নভেম্বর এবং ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ চিকিৎসার অজুহাতে ভারত ভ্রমণের জন্য অনুমতি গ্রহণ করেন তিনি। এসব ভ্রমণ ও ভ্রমণকালীন যোগাযোগের আড়ালেও রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধী বিভিন্ন অভিসন্ধি ছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রশাসনিক কাঠামো ও পেশাদারিত্বকে জলাঞ্জলি দিয়ে নিজস্ব সিন্ডিকেট রাজত্ব কায়েম করায় পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পূর্বেও প্রবীর কুমার গোস্বামীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন তদন্ত পরিচালনা করা হয়। বিভিন্ন প্রকল্পে চরম শিথিলতা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের স্পষ্ট প্রমাণ পেয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাঁকে ইতিপূর্বেও একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ (শো-কজ) প্রদান করে। কিন্তু তৎকালীন সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার ও ক্ষমতাশীনদের প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায় থাকার কারণে এসব বিভাগীয় নোটিশ বা কারণ দর্শানোর কোনো জবাবই তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা পর্যন্ত পৌঁছায়নি।
আরও পড়ুন—সিলেট পাউবি’র অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী প্রবীর কুমারের বিরুদ্ধে যত অ ভি যোগ-পর্ব- ১
বর্তমানে প্রবীর কুমার গোস্বামী এবং তাঁর প্রধান পৃষ্ঠপোষক সাবেক সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ারের অবৈধ উপায়ে অর্জিত অঢেল সম্পদ, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অর্থ পাচারের বিষয়টি দেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের আওতাভুক্ত রয়েছে। সম্প্রতি এডভোকেট আবদুল্লাহ আল হাদী প্রেরিত লিগ্যাল নোটিশের মাধ্যমে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অভ্যন্তরে চেপে বসা দুর্নীতির এই বিশাল চক্রটি নতুন করে নাড়া খেয়েছে। নোটিশে প্রবীর কুমার গোস্বামীর বিরুদ্ধে সরকারি চাকুরির শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে জরুরিভিত্তিতে বিভাগীয় ও প্রশাসনিক তদন্ত শুরু করার পাশাপাশি প্রচলিত আইনে ফৌজদারি মামলা দায়েরের জোরালো দাবি জানানো হয়েছে।
সিলেট অঞ্চলের কৃষকদের স্বার্থ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে এই বিতর্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাকে অবলম্বে বরখাস্ত করে আইনি মুখোমুখি করার দাবি উঠছে সর্বস্তর থেকে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশ জারি এবং বিভিন্ন দপ্তরে তদন্ত প্রক্রিয়া চালু হওয়া সত্ত্বেও প্রবীর কুমার গোস্বামীর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব বা বক্তব্য পাওয়া যায়নি।