সিলেট সিটি কর্পোরেশনে (সিসিক) দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকা একটি প্রভাবশালী, সুসংগঠিত ও দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের নজিরবিহীন জালিয়াতি, ক্ষমতার চরম অপব্যবহার, সরকারি রাজস্ব আত্মসাৎ এবং শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কার্যালয়ে সিসিকের সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও কর্মচারীদের সুনির্দিষ্ট তালিকা ও অপরাধের বিবরণ উল্লেখ করে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থার আবেদন দাখিল করেছেন সিসিকের ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ ও সচেতন নাগরিকদের পক্ষে সিলেট নগরীর ২১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান।
বিভিন্ন অনুসন্ধান, ফাঁস হওয়া অডিও কল রেকর্ড, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং দাপ্তরিক নথিপত্রের ভিত্তিতে দেখা গেছে, সিসিকের অভ্যন্তরে জালিয়াতি, ভুয়া ইমারত নকশা অনুমোদন, সিল ও স্বাক্ষর জালিয়াতি, পে-অর্ডার কারসাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য, দিনমজুর কর্মচারীদের মজুরি আত্মসাৎ এবং প্রবঞ্চনার এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলা হয়েছে। নিচে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনীত যাবতীয় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও গণমাধ্যমে ইতিপূর্বে উত্থাপিত তথ্যাদি বিস্তারিত উপস্থাপন করা হলো। সিসিকের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আ ন ম মনসুফ ও তাঁর ছেলে সিসিকের সহকারী প্রকৌশলী (বর্তমানে পলাতক) মোহতাসিম আহমেদ তানভীরের যৌথ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়ে আসছিল এই সিন্ডিকেট। সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসনিক ও প্রকৌশল সংক্রান্ত ফাইল অনুমোদন, নকশা যাচাইকরণ ও পে-অর্ডার জমা দেওয়ার নির্ধারিত সরকারি দফতর থাকলেও, সহকারী প্রকৌশলী মোহতাসিম আহমেদ তানভীরনিজের বাসভবনের শোয়ার ঘরকে (বেডরুম) জালিয়াতির মূল কেন্দ্রে পরিণত করেন।
সিলেট নগরীর ঐতিহ্যবাহী সুরমা মার্কেট থেকে সিসিকের সাবেক মেয়র ও বর্তমান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সচিব, প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং নির্বাহী প্রকৌশলীসহ শীর্ষ পর্যায়ের সকল কর্মকর্তার হুবহু নকল সিল তৈরি করানো হয়। সরকারি নথি অনুমোদনে জালিয়াতির প্রতিটি ধাপে তানভীরকে সহায়তা করতেন তাঁর স্ত্রী তান্নী। নথিপত্র বিশ্লেষণ ও অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে জানা যায়, সিসিকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক স্বাক্ষর নিখুঁতভাবে নকল ও জাল করার মূল কাজ করতেন তান্নী নিজে। তানভীরের শোয়ার ঘরে বসেই রাতারাতি অবৈধ নকশা ও বিল্ডিং ফাইলের অনুমোদন তৈরি করা হতো। সিল-স্বাক্ষর জাল করার প্রক্রিয়া এবং কোন ফাইল থেকে কত টাকা ঘুষ গ্রহণ করা হয়েছে, তার বিস্ফোরক বিবরণ সংবলিত অডিওকল রেকর্ড ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর আইনি ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক শাস্তি থেকে বাঁচতে তানভীর ও তাঁর স্ত্রী তান্নী গোপনে বিদেশে পালিয়ে যান। ছেলে ও পুত্রবধূ বিদেশে পালিয়ে গেলেও সিসিকের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির মূল ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন তানভীরের বাবা ও প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আ.ন.ম মনসুফ।
মনসুফ সিসিকের দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতার বলে সিসিকের জন্য বরাদ্দকৃত বিলাসবহুল জিপ গাড়ি ব্যবহার করে আসছেন। দুদক ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিতে তিনি সিসিকের জমিতে মাত্র ১ টাকা ভাড়ায় বসবাস দেখালেও, নগরীর জিন্দাবাজার, নয়াসড়ক ও বন্দরবাজারসহ প্রতিটি অভিজাত বাণিজ্যিক মার্কেটে মনসুফ পরিবারের নামে অন্তত তিনটি করে দোকান কোঠা রয়েছে। এছাড়া বহুতল ভবন, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও একাধিক ব্যক্তিগত গাড়ি রয়েছে তাঁর।
চলমান পর্ব ১