সিলেটের পর্যটন, সীমান্ত বাণিজ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এলাকা গোয়াইনঘাট উপজেলার ঐতিহ্যবাহী তামাবিল স্থলবন্দর, নৈসর্গিক জাফলং এবং সোনাটিলা সীমান্ত এলাকা এখন এক ভয়াবহ অপরাধ চক্রের দখলে। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষ, স্থানীয় ব্যবসায়ী সমাজ এবং বিএনপির দীর্ঘদিনের নির্যাতিত নেতাকর্মীরা আশা করেছিলেন যে এলাকায় আইনি শাসন ফিরে আসবে।
তারা মনে করেছিলেন যে দীর্ঘদিন ধরে দমন-পীড়নের শিকার নেতাকর্মীরা এবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন, বন্ধ হবে দখলদারি ও চাঁদাবাজি, আর পাথর কোয়ারিসহ বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়াবে সীমান্ত এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত হাজার হাজার পরিবার। কিন্তু স্থানীয়দের সেই আশা ও স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়নি। ক্ষমতার পালাবদলে অপরাধের রাজত্ব বন্ধ হওয়া তো দূরের কথা, কেবল হাতবদল হয়েছে দখলের নেতৃত্ব। রাজনৈতিক মানচিত্রের পরিবর্তনের সাথে সাথেই এক অলৌকিক ও অনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সিলেট জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক এবং সাবেক জেলা পরিষদ সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম শাহপরাণের নেতৃত্বে নতুন করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্য।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরপরই তৈরি হওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাময়িক নিষ্ক্রিয়তা ও প্রশাসনিক শূন্যতার পূর্ণ সুযোগ নেন রফিকুল ইসলাম শাহপরাণ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সিলেট-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, চিহ্নিত অর্থ জোগানদাতা এবং শীর্ষ চোরাকারবারীরা যখন তীব্র নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল, ঠিক তখনই শাহপরাণ তাদের প্রধান রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন। রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদান, আইনি ঝামেলা ও মামলা থেকে বাঁচানো এবং পূর্বে গড়ে তোলা অপরাধের সিন্ডিকেট নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে ওই চিহ্নিত আওয়ামী চক্রটির কাছ থেকে শাহপরাণ এককালীন নগদ ২ কোটি টাকা গ্রহণ করেন।
এই বিপুল আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে বিগত ১৪ বছর ধরে সাধারণ ব্যবসায়ীদের নির্যাতনকারী অসাধু চক্রটিকে তিনি পুনরায় এলাকায় পুনর্বাসিত করেন এবং তামাবিল, জাফলং ও সোনাটিলা সীমান্ত এলাকার চোরাচালান ও চাঁদাবাজির একক আধিপত্য নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। বর্তমানে তিনি ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সমন্বয়ে ১৮ সদস্যের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন, যার মূল কাজ হলো শুল্ক ফাঁকি, অবৈধ পণ্য পাচার, ভারতীয় সামগ্রী সীমান্ত পার করা, বালু-পাথর লুটপাট এবং আমদানিকৃত পণ্যবাহী যানবাহন থেকে সরাসরি প্রকাশ্যে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করা। এই সংগঠিত সিন্ডিকেটের সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে জাতীয় অর্থনীতি ও সরকারি রাজস্ব খাতের ওপর। তামাবিল স্থলবন্দর কেন্দ্রিক কাস্টমস ফাঁকির এক অভিনব ও নজিরবিহীন উৎসব শুরু করেছে এই চক্র। ভারত থেকে আসা উচ্চ শুল্কের বিভিন্ন পণ্য, দামি সুতি কাপড়, শাড়ি ও লেহেঙ্গার চালান কোনো প্রকার কাস্টমস এন্ট্রি ও শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই সুকৌশলে বন্দর পার করে দেওয়া হচ্ছে।
প্রাতিষ্ঠানিক ও গোপন অনুসন্ধানের তথ্যমতে, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স বা ছাড়পত্র ছাড়াই সুকৌশলে বন্দর থেকে সরাসরি বের করে দেওয়া হয়েছে অন্তত ১৪টি বিশালাকার পণ্যবাহী ট্রাক ও কনটেইনার। কাস্টমস কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, এসব ট্রাকে থাকা প্রতি চালানে গড়ে ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা করে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। কেবল এই ১৪টি গাড়ির চালান কাস্টমস ছাড়া বের করে দিয়েই শাহপরাণ সিন্ডিকেট সরকারের কোষাাগারের বিপুল অঙ্কের, অর্থাৎ ১৬ কোটি ১০ লাখ টাকার রাজস্ব আত্মসাৎ করেছে। ভারত থেকে আসা ৩০ টনেরও বেশি মালামাল সমৃদ্ধ এসব ট্রাক বন্দর এলাকা অতিক্রম করে তাৎক্ষণিকভাবে দেশীয় ট্রাকে লোড করা হয় এবং মাঝরাতে বা ভোরে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কাস্টমস ফাঁকির এই প্রকাশ্য অপকর্মের পাশাপাশি এলসি পেপারে পণ্যের ওজন ও পরিমাণের ভুয়া তথ্য উপস্থাপন করে জালিয়াতি এবং জাল কাগজপত্র বানিয়ে অসাধু বাণিজ্য চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি তামাবিল স্থলবন্দর ও সংলগ্ন সড়কগুলোতে যাতায়াতকারী সাধারণ পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের জিম্মি করে নিয়মিত চাঁদাবাজি চালানো হচ্ছে। প্রতিদিন আমদানিকৃত পাথরবাহী ট্রাক ও ভারতীয় অন্যান্য পণ্যবাহী যান থেকে দুটি পৃথক ধারায় বেপরোয়া গতিতে চাঁদা আদায় করা হয়। প্রথম ধারায়, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০০টি পাথরবাহী ট্রাক থামিয়ে প্রতি ট্রাক থেকে ৫০০ টাকা করে মোট ৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা চাঁদা তোলা হয়। কেবল পাথরবাহী যানবাহন থেকেই শাহপরাণ সিন্ডিকেটের পকেটে যাচ্ছে মাসে প্রায় ১ কোটি টাকা। দ্বিতীয় ধারায়, ভারত থেকে কয়লা ও চুনাপাথর নিয়ে আসা প্রতিদিনের আনুমানিক ২০০ থেকে ২৫০টি আমদানিকৃত ট্রাকের ওপর বসানো হয়েছে জোরপূর্বক ‘গেট পাস’ ফি। সরকারি নিয়মকানুনের কোনো পরোয়া না করে প্রতি ট্রাক থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৯৫০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে দৈনিক প্রায় দুই লাখ টাকা অতিরিক্ত চাঁদাবাজি হচ্ছে।
এই অনৈতিক অর্থ তোলার জন্য অঞ্চলভেদে ভাগ করে রাখা হয়েছে ৫টি বিশেষ লাইনম্যান গ্রুপ। এর সাথে যুক্ত রাখা হয়েছে ভুয়া সিআইএডিএফ প্রতিনিধি এবং সশস্ত্র মোটরসাইকেল বাহিনীর নিজস্ব পাহারাদার। তারা অস্ত্রের মুখে ও ক্যাডার শক্তির ভয় দেখিয়ে চলন্ত ট্রাকের গতিপথ রোধ করে চালকদের কাছ থেকে এই টাকা আদায় করে থাকে। সীমান্ত ও পরিবহন খাতের পাশাপাশি সিলেটের নৈসর্গিক পর্যটন কেন্দ্র জাফলংয়ের পরিবেশ ধ্বংসের নেপথ্যেও রয়েছে এই চক্রের প্রত্যক্ষ হাত। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রশাসনিক শিথিলতার সুযোগ নিয়ে জাফলং জিরো পয়েন্ট ও পরিবেশ-প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন সংরক্ষিত এলাকার সুরক্ষায় বসানো নিরাপত্তা সিসি ক্যামেরাগুলো রাতারাতি বিকল করে দেওয়া হয়।
এরপর টানা কয়েক দিন ও রাতের আঁধারে জাফলং কোয়ারি ও নদী অববাহিকা থেকে প্রায় ১ কোটি ঘনফুট পাথর এবং বিপুল পরিমাণ বালু লুট করে নিয়ে যায় এই সিন্ডিকেট, যার আনুমানিক বাজারমূল্য অন্তত ১০০ কোটি টাকা। প্রকৃতির এমন নির্মম বিনাশ ও জাতীয় সম্পদ লুটের ঘটনায় পরবর্তীতে পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন বাধ্য হয়ে ১১৪ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা দায়ের করে। ওই মামলায় পুলিশ রফিকুল ইসলাম শাহপরাণকে ২ নম্বর প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু রহস্যজনক কোনো অদৃশ্য শক্তির বলে পুলিশ তাকে বা তার চিহ্নিত সহযোগীদের গ্রেফতার না করায় তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়িয়ে একের পর এক অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে শাহপরাণের এই মাফিয়া নেটওয়ার্কের বেশ কয়েকজন মূল পরিচালকের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। স্থানীয় প্রভাবশালী লিপু, কাসেম, মিজান এবং ফখরুল চেয়ারম্যানের মতো ব্যক্তিবর্গ শাহপরাণের প্রধান সহযোগী হিসেবে মাঠে কাজ করছেন। এছাড়া সাবেক এমপি ইমরান আহমদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অনুসারী, যিনি এলাকায় ‘তামাবিল ভুমি’ নামে পরিচিত, তিনি শাহপরাণের সরাসরি ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে সীমান্ত চোরাচালানের মূল সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছেন।
পাশাপাশি রাসেলের মতো ব্যক্তিরা মাঠ পর্যায়ে লাইনম্যান ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণসহ চাঁদাবাজির টাকা সংগ্রহের বিষয়টি তদারকি করেন। সম্প্রতি এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে সোনা, বাঁশ ও মদের সীমান্ত চোরাচালানও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এলাকার শান্তিশৃঙ্খলাকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে। রফিকুল ইসলাম শাহপরাণের এমন বেপরোয়া ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিএনপির কেন্দ্রীয় হাইকম্যান্ড এবং সিলেট জেলা বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দলীয় নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এর আগেও দলিল জালিয়াতি, অনৈতিক আর্থিক লেনদেন ও চরম দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে ২০২৩ সালের ১৩ অক্টোবর বিএনপির কেন্দ্রীয় জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে রফিকুল ইসলাম শাহপরাণের সিলেট জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক পদ স্থগিত করা হয়েছিল।
কিন্তু পরবর্তীতে তিনি নানা কৌশলে সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করিয়ে পুনরায় পদে ফেরেন এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দ্বিগুণ উদ্যমে অপরাধ কর্মকাণ্ড শুরু করেন।এদিকে, একের পর এক কাস্টমস ফাঁকি, চাঁদাবাজি ও চোরাচালানের সংবাদ মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট তথ্য উঠে আসার পর এবং স্থানীয় সচেতন মহলে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ার প্রেক্ষিতে নিজের অবস্থান শক্ত করতে ও অপকর্ম ঢাকা দিতে তৎপর হয়ে ওঠেন রফিকুল ইসলাম শাহপরাণ। সম্প্রতি তিনি সিলেটের তামাবিল পাথর আমদানিকারক গ্রুপের কার্যালয়ে এক তড়িঘড়ি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। সেখানে সংগঠনের আহ্বায়ক হিসেবে লিখিত বক্তব্য পাঠ করে তিনি তার বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগকে ‘মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার’ বলে দাবি করেন। তিনি দাবি করেন, তামাবিল পাথর আমদানিকারক গ্রুপের কোনো নেতা বা সদস্য কোনো ধরনের অনৈতিক আর্থিক লেনদেন বা কাস্টমস ফাঁকির সাথে জড়িত নন। তবে শাহপরাণের এই সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে সিলেটজুড়ে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক ও নানা প্রশ্ন।
পর্ব-১